বৃহস্পতিবার   ১৭ জুন ২০২১ || ৪ আষাঢ় ১৪২৮ || ০৫ জ্বিলকদ ১৪৪২

অপরাজেয় বাংলা :: Aparajeo Bangla

লাল মাংস খাওয়া কি জরুরি?

শেখ আনোয়ার

১১:১৪, ১১ মে ২০২১

আপডেট: ১১:১৫, ১১ মে ২০২১

২৯৪

লাল মাংস খাওয়া কি জরুরি?

পবিত্র ঈদুল ফিতর এসে গেলো। সেমাই খাওয়ার এই ঈদেও লাল মাংস খাওয়া বেশি হয়। গরু, খাসি, ভেড়া প্রভৃতি পশুর মাংস লাল। এসব মাংসে মায়োগ্লোবিনের পরিমাণ অনেক বেশি থাকে বলে কাঁচা অবস্থায় টকটকে লাল দেখায়। এই লাল মাংস পছন্দ করেনা এমন মানুষ পাওয়া কঠিন। প্রোটিনের সমৃদ্ধ উৎস লাল মাংস। এই লাল মাংসের কারণেই শরীরে যেসব রোগ বাসা বাঁধে তা অন্য খাদ্যের পক্ষে সম্ভব নয়। তাই লাল মাংসের ভয়ানক দিক সম্পর্কে পুষ্টি বিজ্ঞানীরা উদ্বিগ্ন। 

ক’দিন আগেও লাল মাংস খাওয়ার পক্ষে বলা হতো, ‘যেসব প্রাণী ঘাস খেয়ে জীবন ধারণ করে, সেসব প্রাণীর মাংস খাওয়া খারাপ কিছু না।’ এবার লাল মাংস ভক্ষকদের জন্য দুঃসংবাদ দিলো ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন এক গবেষণা। গবেষণায় লাল মাংসকে ঢালাওভাবে বাদ দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, ‘সত্যিকার অর্থেই মানুষ মাংসাশী জীব নয়।’ গবেষণায় বলা হয়, ‘বেশির ভাগ মানুষের ক্যান্সারের জন্য লাল মাংস ভয়ংকর কালপ্রিট হিসেবে চিহ্নিত। মানে লাল মাংস খেলে মানুষের ক্যান্সার হয়। কিন্তু বাঘ, সিংহ বা অন্য কোন মাংসাশী প্রাণীর ক্যান্সার হয় না কেনো? উত্তরে বিজ্ঞানীরা জানান- ‘এর কারন সকল স্তন্যপায়ী প্রাণীর শরীরে স্বয়ংক্রিয়ভাবে উৎপন্ন হয় নিউইউ ৫ জিসি’ নামের অবাক করা এক বিশেষ চিনি যৌগ। লাল মাংসের ক্ষতিকর নিঃসরনজনিত প্রদাহ বা ইনফ্লামেটরি যৌগ’র বিরুদ্ধে স্তন্যপায়ী প্রাণীদের শরীরে এই চিনি যৌগ স্বয়ংক্রিয় প্রতিরোধ শক্তি গড়ে তোলে। কিন্তু মানুষের দেহে এই চিনির যৌগ অনুপস্থিতির কারনে সার্বক্ষণিক অ্যান্টিবডি উৎপাদনের জন্য লাল মাংসে বিদ্যমান চিনির যৌগ মানব শরীরের রোগ প্রতিরোধী ব্যবস্থাকে তাড়িত করে। এই তাড়না মানব শরীরের কোষে ধারাবাহিক প্রদাহ সৃষ্টি করে। এই প্রদাহ এক পর্যায়ে শরীরের কোষে টিউমার সৃষ্টি করে এবং মানুষকে ক্যান্সারের দিকে ধাবিত করে।

পুষ্টি বিজ্ঞানীরা বলেন, ‘লাল মাংসের প্রধান ক্ষতি হলো, এর উচ্চ মাত্রার ট্রাইগ্লিসারাইড (টিজি) ও এলডিএল। যা ক্ষতিকর কোলেস্টেরল হিসেবে পরিচিত। এগুলোতে সম্পৃক্ত চর্বির (স্যাচুরেটেড ফ্যাট) মাত্রা বেশি থাকে। ফলে বেড়ে যেতে পারে কোলেস্টেরল সমস্যা।’ এই কোলেস্টেরল ধমনির প্রাচীরকে পুরু করে তোলে। ফলে হৃদপিণ্ডে রক্ত সঞ্চালন কমে যায়। একপর্যায়ে রক্তনালির ব্লক তথা হৃদরোগের অন্যতম কারণ হয়ে দেখা দেয়। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা যায়, প্রতিদিন ১০০ গ্রামের বেশি লাল মাংস খেলে হৃদরোগে মৃত্যু ঝুঁকি ১৫ শতাংশ, ব্রেইন স্ট্রোকের ঝুঁকি ১১ শতাংশ এবং বৃহদান্ত্র ও প্রোস্টেট ক্যান্সারের ঝুঁকি প্রায় ১৭ শতাংশ বেশি হয়ে থাকে। এছাড়া লাল মাংস খেলে গ্যাস্ট্রিক ও কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা হতে পারে। আগেই বলা হয়েছে, লাল মাংসে থাকা বিশেষ ধরনের ইনফ্লামেটরি যৌগ পাকস্থলীর প্রদাহের জন্য দায়ী। এই যৌগ পাকস্থলী, ক্ষুদ্রান্ত্র ও বৃহদান্ত্রের ক্যান্সারের জন্যও দায়ী। এছাড়াও ফুসফুস আক্রান্ত হওয়া, কোলন ও স্তন ক্যান্সারের ভূমিকা থাকে। যতো বেশি লাল মাংস খাওয়া হয়, এসবের ঝুঁকি ততোই বেড়ে যায়। এমনকি অতিরিক্ত লাল মাংস গাউট, আর্থ্রাইটিস, পেপটিক আলসার, পিত্তপাথর, প্যানক্রিয়াসের প্রদাহ, কিডনি রোগ প্রভৃতি সৃষ্টি করতে পারে। তাই স্থুলতা, ডায়াবেটিসের ঝুঁকি, রক্তচাপ বা হৃদরোগীরা লাল মাংস যথাসম্ভব বর্জন করুন।

পুষ্টিবিজ্ঞানীরা জানান, টাটকা বা ফ্রেশ লাল মাংসের চেয়ে প্রক্রিয়াজাত লাল মাংসের (সসেজ, সালামি, বেকন, লাঞ্চন মিটস, হট-ডগস্ ইত্যাদি) আরও বেশি ক্ষতিকর। কারন এতে প্রচুর লবণ, নাইট্রেটস ও নানা রকম প্রিজারভেটিভ থাকে। পুষ্টিবিজ্ঞানীদের মতে, প্রক্রিয়াজাত লাল মাংস দৈনিক ৫০ গ্রামের মতো গ্রহণে হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ে ৪২ শতাংশ আর ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ে ১৯ শতাংশ। এছাড়াও প্রক্রিয়াজাত লাল মাংসে বেশি রয়েছে টিনিয়া সোলিয়াম নামের এক ধরনের বিশেষ কৃমিজাতীয় পরজীবী। ঠিকভাবে মাংস সিদ্ধ না হলে এই কৃমিতে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। শিক কাবাব, বারবিকিউ খেলে এর ঝুঁকি থাকে বেশি। এ জন্য কাবাব বা আধা সিদ্ধ মাংস পারতপক্ষে পরিহার করা শ্রেয়। সম্ভব হলে প্রক্রিয়াজাত মাংস এড়িয়ে চলুন। জারিত বা প্রক্রিয়াজাত মাংসের ভয়ঙ্কর দিক সম্পর্কে একদল বিজ্ঞানী উদ্বেগজনক তথ্য প্রকাশের মাধ্যমে লোকজনকে সতর্ক করার প্রয়াস পেয়েছেন। তাদের ভাষায়- ‘প্রক্রিয়াজাত লাল মাংস অন্ত্রে ক্যান্সার সৃষ্টির ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয় ৬৩ ভাগ।’ 

প্রতিদিন পর্যাপ্ত খাবার খাওয়া শরীরকে সুস্থ সবল রাখার অন্যতম শর্ত। কারণ প্রতি মুহুর্তে শরীরের যেসব কোষ ক্ষয় হচ্ছে তা পুনর্গঠনে প্রয়োজন যথাযথ পুষ্টি। আর এর যোগানদাতা খাদ্যের মধ্যে রয়েছে- মাছ-মাংস, ফলমূল, শস্যকণা, সবজি এবং নানা ধরনের খনিজ উপাদান। একথাও সত্য, যে খাদ্য শরীরের পুষ্টি যোগায় সে খাদ্য কোনো কোনো ক্ষেত্রে রোগের আকর। এর মধ্যে লাল মাংসের নেতিবাচক ও  ইতিবাচক কার্যকারিতা বিশেষ উলে­খযোগ্য। 

তবে হ্যাঁ। অল্প বয়সী ও ছোটদের জন্য পুষ্টিগুণের বিচারে লাল মাংস অনেক সমৃদ্ধ। ছোটদের সুস্থ দেহের জন্য যেসব খাদ্য উপাদান অতি দরকারি তা রয়েছে লাল মাংসে। দেহের অস্থি, পেশি, দাঁত, নখসহ নানা দেহযন্ত্র প্রোটিন দিয়ে তৈরি। প্রোটিন থেকেই তৈরি হয় রোগ প্রতিরোধী অ্যান্টিবডি। হরমোন তৈরিতেও প্রয়োজন এই প্রোটিনের। প্রোটিনসহ লাল মাংসে এমন কিছু খাদ্য উপাদান বর্তমান যা অন্য খাদ্যে প্রায় বিরল। যেমন- লাল মাংসে প্রচুর আয়রন, বিভিন্ন ভিটামিন, ফসফরাস, সেলেনিয়াম, জিংক ও খনিজ রয়েছে। এগুলো শিশু-কিশোরদের শরীর গঠনের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। ছোটদের শরীরের বৃদ্ধি সাধন, ক্ষয়পূরণ ও শরীর গঠনে লাল মাংসের ভূমিকা অপরিসীম।  তাই শিশু-কিশোরদের শরীরের জন্য লাল মাংসের প্রয়োজন রয়েছে বৈকি! 

লেখক: বিজ্ঞান লেখক ও গবেষক।

Dutch-Bangla Bank
TELETALK