?>

বুধবার   ১৪ এপ্রিল ২০২১ || বৈশাখ ২ ১৪২৮ || ০১ রমজান ১৪৪২

অপরাজেয় বাংলা :: Aparajeo Bangla

ভয়ংকর গেরিলা ট্রেনিং কোবরা গোল্ড

শেখ আনোয়ার

১২:৪৮, ২ এপ্রিল ২০২১

আপডেট: ০১:১৬, ৫ এপ্রিল ২০২১

২৮৪

ভয়ংকর গেরিলা ট্রেনিং কোবরা গোল্ড

বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের মূল শক্তি হচ্ছে জনগণ। তবে সকল জনগণ নয়। দেশপ্রেমিক জনগণ। দেশের দেশপ্রেমিক জনগণ মুক্তিসংগ্রামের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে উঠায় শত্রু শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করে দেশ মুক্ত করা সম্ভব হয়। আমাদের গেরিলা যুদ্ধের শুরুটা ছিলো আপামর জনগণের সমর্থনকে ভিত্তি করে। একাত্তরের ৭ই মার্চে বঙ্গবন্ধু’র ডাকে যখন পরিষ্কার হয়ে উঠে যে, দেশ স্বাধীন করতে হলে সশস্ত্র গেরিলা লড়াই ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই। তখনই ছাত্র-ছাত্রী, শ্রমিক-কৃষক ও বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে নিজেদের মতো করে গেরিলা যুদ্ধের নানাবিধ ট্রেনিং ও প্রতিরোধের জন্য অস্ত্র ও বোমা তৈরির প্রচেষ্টা শুরু হয়ে যায়। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে এদেশের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সামনে উদাহরণ ছিলো ভিয়েতনামের গেরিলা যুদ্ধ। কারণ আমেরিকান সুশিক্ষিত ও প্রশিক্ষিত সৈন্যদের বিরুদ্ধে মরণপণ লড়াই করে কুপোকাত করেছিলো ভিয়েতনামের দেশপ্রেমিক গেরিলারা। মুক্তিযুদ্ধের সময় তৎকালিন ছাত্রলীগের উদ্যোগে ছাত্র-ছাত্রীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠে ট্রেনিং ও প্যারেড শুরু করে। এরপর আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারত এই ছাত্র-ছাত্রীদের আধুনিক গেরিলা প্রশিক্ষণ দেয়ার ব্যবস্থা করে। এছাড়াও পাক সেনাবাহিনী থেকে যে সমস্ত দেশপ্রেমিক বাঙালি সেনা কর্মকর্তা চাকরির মায়া ত্যাগ করে স্বাধীনতাযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলো তারাও বিভিন্নভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের গেরিলা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে। ফলে বিশেষ গেরিলা প্রশিক্ষণে হাজার হাজার গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা জলে স্থলে জঙ্গলে ৯ মাস পাক সেনাদের প্রতিরোধ ব্যুহ তৈরি করে মুক্ত স্বাধীন করে বাংলাদেশ।

তেমনি একটি গেরিলা ট্রেনিংয়ের নাম কোবরা গোল্ড। এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে কোবরা গোল্ড নামে একটি বিখ্যাত কমান্ডো সেনা প্রশিক্ষণের প্রথা আজও প্রচলিত রয়েছে। থাইল্যান্ড সেনাবাহিনীর কমান্ডো সদস্যরা এই প্রশিক্ষণের বিশেষজ্ঞ হিসেবে গোটা বিশ্বে সুপরিচিত। সম্প্রতি থাইল্যান্ডের চান্থাবুড়ি এলাকায় সমাপ্ত হলো থাই-মার্কিন বার্ষিক ‘কোবরা গোল্ড’ এর চল্লিশতম ব্যাচের প্রশিক্ষণ। প্রতিবছর বিদেশী সেনারা কোবরা গোল্ড প্রশিক্ষণ নিতে থাইল্যান্ড আসে। এই প্রশিক্ষণের মেয়াদকাল এক বছর। এবারে পর্যবেক্ষক ও অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ছিল ২৯টি দেশের সেনারা। মূলত জঙ্গলে কীভাবে সেনাদের বেঁচে থাকতে হয়, তারই বিস্তারিত হাতে কলমে প্রশিক্ষণ দিয়ে সেনাদের সুদক্ষ করে গড়ে তোলা হয়। একাজে নেতৃত্ব দেন থাইল্যান্ডের সুদক্ষ জংলী কমান্ডো প্রশিক্ষকগণ। কোবরা গোল্ড প্রশিক্ষণে অন্যদেশের সেনা কর্মকর্তারা সব সময় সঙ্গে অবস্থান করে সার্বক্ষণিক হাতে কলমে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে থাকেন।

জঙ্গলের ভেতর যুদ্ধ চলাকালে কী খাবার পাওয়া যায়? তাতো আর সাধারণ সেনাদের জানা সম্ভব নয়। তাই সবধরণের খাবার খাওয়ার প্রশিক্ষণ দেয়া হয় এই কোবরা গোল্ড প্রশিক্ষণে। সেনাদের শিখিয়ে দেয়া হয়, কীভাবে কেঁচো ধরে খেতে হয়? কীভাবে জঙ্গলে কীটপতঙ্গের সঙ্গে যুদ্ধ করে বেঁচে থাকতে হয়? জঙ্গলের ভেতর সেনাদের কীভাবে সাপ খেয়ে বেঁচে থাকতে হয়? মাকড়সার ডিম খেয়ে পুষ্টির অভাব মেটানো যায় কিভাবে? এসব ছাড়াও সেনাদের নিজ হাতে মাকড়সা ধরে এনে খেতে হয়। মাকড়সার ডিম দেখে কমান্ডোরা কীভাবে চিনবেন? তা হাতে কলমে শেখানো হয় সেনাদের। দিনের পর দিন মাকড়সা ধরে সেনাদের খাওয়ায় অভ্যস্ত করা হয়। কীভাবে সাপ, মাকড়সাসহ অন্যান্য কীটের সঙ্গে জীবন কাটাতে হয়? সবই পাক্কা প্রশিক্ষণ হয়ে যায় থাইল্যান্ডের বিশ্বখ্যাত কোবরা গোল্ড প্রশিক্ষণে। এই প্রশিক্ষণে গোখরো সাপের কামড় ইচ্ছে করেই খেতে হয়। সাপের কামড় টেস্ট করতে হয়। এটাই এই জংলী ট্রেনিংয়ের সবচেয়ে বড় ঝুঁকিপূর্ণ ভয়ের কাজ। এরপর রয়েছে, কেউটে গোখরো সাপের রক্ত পান করা। জঙ্গলে বেঁচে থাকার প্রশিক্ষণ হিসেবে কিভাবে কেউটে সাপের রক্ত পান করে বেঁচে থাকতে হয়?

কোন চিন্তা নেই। থাই সেনা কমান্ডোরা কেউটে সাপের রক্ত নিজেরা সবার সামনে আপন মনে পান করে প্রথমে দেখিয়ে দেন। তারপর সেনাদের খেতে অভ্যস্ত করান। কীভাবে জঙ্গলে গোখরো কেউটে সাপ ধরতে হয় তা আগেই দেখিয়ে শিখিয়ে দক্ষ করে তুলেন প্রশিক্ষক। এরপর একে একে সব সেনা নিজ হাতে সাপ ধরা শিখে যায়। সাপ ধরার পর সাপের বিষ দাঁত বের করে সেই সাপ কিভাবে কাঁচা আস্ত চিবিয়ে খেতে হয় তা হাতে কলমে দেখিয়ে দেন থাই কমান্ডো কমান্ডারগণ। এখানেই শেষ নয়। এছাড়া রয়েছে- জঙ্গলে প্রাকৃতিক পানি পেতে কি করতে হয়? বিভিন্ন জংলী গাছের মধ্যে জমে থাকা পানি পেতে এমন সব উদ্ভিদগুলো চিনিয়ে দেয়া হয় প্রশিক্ষণে। আরও অবাক করা ব্যাপার হলো কন্ডমের ভেতর ভাত রান্না কীভাবে করতে হয় সেই পদ্ধতিও শিখিয়ে দেন থাইল্যান্ডের কমান্ডো কমান্ডার।

থাইল্যান্ডের সেনারা মিত্রবাহিনীর সেনাবাহিনী হিসেবে বরাবরই সুপরিচিত। এজন্যে প্রতিবছর মার্কিন ও থাই সেনাদের প্রশিক্ষণ বিনিময় হয়ে থাকে। বছরে বারো হাজার থাই সেনা আমেরিকায় গিয়ে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে থাকেন। পক্ষান্তরে সমপরিমাণ মার্কিন সেনা থাইল্যান্ডে আসে এই কোবরা গোল্ড নামে জংলী প্রশিক্ষণ নিতে। এতে দু’দেশের সেনাদের মধ্যে সম্পর্কোন্নয়ন ঘটে। থাইল্যান্ডের আঞ্চলিক সমৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতার প্রয়োজনেই সেনাবাহিনীর এসব কার্যক্রম। থাইল্যান্ডে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘কোবরা গোল্ড হচ্ছে আমাদের একটি শক্তিশালী প্রশিক্ষণ। অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কঠিন এক প্রশিক্ষণ বটে! তবে এই প্রশিক্ষণ বিনিময়ের মাধ্যমে আমাদের স্থল, নৌ ও বিমানবাহিনী আরও সুদক্ষ হিসেবে গড়ে উঠেছে।’

উল্লেখ্য, মার্কিন সেনারা কোবরা গোল্ড নামের এই জংলী প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সহনশীলতা, দক্ষতা গড়ে তুলছে। জঙ্গলের হিংস্র প্রতিকূল পরিবেশে বেঁচে থেকে যুদ্ধ করার কায়দা কৌশল রপ্ত করতে পারছে। প্রশিক্ষণের সফল সমাপ্তি দিনে রয়্যাল থাই আর্মি ফোর্স আনুষ্ঠানিকভাবে প্রদান করে থাকে বিখ্যাত কোবরা গোল্ড পদক। সম্প্রতি থাইল্যান্ডের কোবরা গোল্ড জংলী প্রশিক্ষণে মার্কিন সেনারা যেসব বিষয়ে দক্ষ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছে তা হলো- কিভাবে বাইশ প্রজাতির বিষধর সাপের হাত থেকে আত্মরক্ষা করা যায়? দক্ষিণ থাইল্যান্ডের গহীন জঙ্গলের পাঁচ প্রজাতির বিষাক্ত মাকড়সা রয়েছে। সেগুলো থেকে জঙ্গলে কিভাবে বেঁচে থাকা যায়? গোখরো সাপের কামড় জিহবায় টেস্ট করা, সাপের তাঁজা রক্ত, মাংস খাওয়া, বিষাক্ত পোকা মাকড় খাওয়া ইত্যাদি শিখতে জঙ্গলের প্রতিকূল পরিবেশে জঙ্গলে এক বছর অবস্থান করতে হয়।

থাই রাষ্ট্রদূত অতীতের কথা স্মরণ করে ব্যাখ্যা করে বলেন, একদিন মার্কিন জঙ্গী বোমারু বিমান উত্তর পশ্চিম থাইল্যান্ডের বিমানবন্দর ধবংস করে দিয়েছিলো। আজ স্বাধীনতা সমুন্নত রাখা এবং বর্হিশক্তির আগ্রাসন প্রতিরোধ করা আমাদের রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার। অবাক হলেও সত্যি, থাইল্যান্ডের সেনারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করে আধুনিক এফ ১৬ জঙ্গী বোমারু বিমানের যুদ্ধ প্রশিক্ষণ সফলতার সঙ্গে সম্পন্ন করেছে। আমাদের পাইলটরা সেদেশের বিমান ঘাঁটিতে অবস্থান করে প্রশিক্ষণ নিতে পারছে। থাই-মার্কিন যৌথ বাহিনী ইতোমধ্যে স্থল, নৌ ও আকাশ যুদ্ধের সফল প্রশিক্ষণ বিনিময় সম্পন্ন করেছে। বোনাস হিসেবে থাইল্যান্ডের সাধারণ জনগণ এ থেকে পাচ্ছেন যৌথবাহিনীর মেডিক্যাল টিম কর্তৃক বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা। আর প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় যৌথবাহিনীর সার্বক্ষণিক সেবা তো রয়েছেই। তাই একথা নি:সন্দেহে বলা যায়, কোবরা গোল্ড দু’দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের সোনালী প্রতীক বৈকি!

লেখক: বিজ্ঞান লেখক ও গবেষক।

DBBL Nexas Card
TELETALK