বৃহস্পতিবার   ১৭ জুন ২০২১ || ৪ আষাঢ় ১৪২৮ || ০৫ জ্বিলকদ ১৪৪২

অপরাজেয় বাংলা :: Aparajeo Bangla

বিশেষ সাক্ষাৎকার

`চিকিৎসা সম্ভব, সমাজে হিজড়া বা তৃতীয় লিঙ্গ বলে কেউ থাকবে না`

বিশেষ সংবাদদাতা

১৫:৫৪, ১৬ এপ্রিল ২০২১

১০৬০

বিশেষ সাক্ষাৎকার

`চিকিৎসা সম্ভব, সমাজে হিজড়া বা তৃতীয় লিঙ্গ বলে কেউ থাকবে না`

ছবি: সংগৃগীত
ছবি: সংগৃগীত

"এই যে আমরা হিজড়াদের দেখিনা, যাদের আমরা তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ হিসেবে কেতাবি নাম দিয়েছি, এদের কিন্তু সকলেই হয় নারী নয়তো পুরুষ। মানুষের যখন হাত-পা, চোখ, কান এসব প্রধান অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে ত্রুটি থাকে, ত্রুটি নিয়েই জন্ম নেয়, তখন আমরা তাদের বিভিন্ন নামে ডাকি- দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী বাকপ্রতিবন্ধী কিংবা শ্রবণপ্রতিবন্ধি, কেউ কেউ বুদ্ধিপ্রতিবন্ধীও হয়। ঠিক তেমনি এই মানুষগুলো আর কিছু নয়, স্রেফ লিঙ্গ প্রতিবন্ধী। তাদের থাকে কিছু লিঙ্গ বিকাশজনিত ত্রুটি, কারো অস্পষ্ট বা দুর্বোধ্য লিঙ্গও থাকে। এটাই। আর এটা নিরাময়যোগ্য। এদেরকে ভালো কিংবা স্বাভাবিক করে তোলা যায়।"

কথাগুলো একটানা বলেই থামলেন ডা. মো. নজরুল ইসলাম আকাশ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের পেডিয়াট্রিক সার্জারি বিভাগে কনসালট্যান্ট চিকিৎসক তিনি। 

কিভাবে? সে প্রশ্ন করতেই অভিজ্ঞতা, দক্ষতা ও স্বপ্নের ঝাঁপি খুলে বসলেন এই বিশেষজ্ঞ সার্জন। এবং শোনালেন, তার নিজের হাতেই এরই মধ্যে কয়েক ডজন এমন সার্জারি সম্পন্ন করেছেন। এবং তাতে অনেক লিঙ্গ প্রতিবন্ধীকে সুস্থ্য-স্বাভাবিক জীবন দিতে পেরেছেন।

কিন্তু মানুষ কী এটা জানে? তারাতো বিষয়টিকে ভবিতব্য হিসেবেই মেনে নেয়, এবং সন্তানটিকে একসময় পরিবার থেকে চলে যেতে হয়। এমন সদ্বিগ্ধ প্রশ্নে ডা. আকাশ বললেন, এই যে হিজড়া কথাটি চালু রয়েছে যুগের পর যুগ জুড়ে। এটা আর কিছুই না। মানুষের এক ভ্রান্ত ধারণা। কিন্তু বলা যায়- ভ্রান্তির মধ্যে থেকে যাওয়া। তৃতীয় লিঙ্গ বলে কিছু নেই। মানব কুলে দুটোই প্রজাতি- স্ত্রী ও পুরুষ। সুতরাং এদের প্রত্যেকে হয় স্ত্রী নয় পুরুষ। আর চিকিৎসা বিজ্ঞান এতদূর এগিয়েছে যে, সামান্য কিছু সার্জারি করে দিলে তা নিজ পরিচয়েই বেড়ে উঠতে পারে।

কেমন হয় সে সার্জারি? 

সে বিষয়ে বলার আগে আমি কেনো ঠিক এমনটি হয় তার একটা ব্যাখ্যা তুলে ধরতে চাই, বললেন ডা. নজরুল ইসলাম আকাশ। তিনি বলেন, ক্রোমোজম, জননাঙ্গ, লিঙ্গ সম্পর্কিত হরমোন বা লিঙ্গ বৈশিষ্ট্যের ভিন্নতায় এটা হয়। অর্থাৎ স্বাভাবিক থেকে অন্য কিছু। এই ভিন্নতা বিভিন্ন মাত্রায় হতে পারে, আবার বেড়ে ওঠার বিভিন্ন পর্যায়েও হতে পারে। কখনো যা জন্মের পরপরই দেখা যায়। কারো কারো ক্ষেত্রে বয়ঃসন্ধিকালে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আবার কারো কারো ক্ষেত্রে বিষয় জীবনের কোনো পর্যায়েই জিনের পরীক্ষা (Genetic test) ছাড়া বোঝা প্রায় অসম্ভব। 

পৌরানিক এবং প্রাক-আধুনিক যুগ থেকেই এই ধরনের বৈশিষ্ট্য সম্বলিত মানব প্রজাতির অস্তিত্বের কথা আমরা ইতিহাস ঘেঁটে জেনেছি, বলেন ডা. নজরুল। তিনি জানান, যিশুখ্রীষ্টের জন্মের শত বর্ষ আগে গ্রিক ঐতিহাসিক ডিওডোরাস সিক্যুলাস (Diodorus Siculus) তার 'হারমোফ্রডিটাস (Hermaphroditus)' বিষয়ক লেখায় এদেরকে এভাবে সংজ্ঞায়িত করেন এভাবে- “Hermaphroditus is born with a physical body which is a combination of that of a man and that of a women” and with supernatural properties। পরবর্তীতে ইউরোপ এবং পশ্চিমা বিশ্বে এবং পৃথিবীর অন্যান্য কিছু দেশে এদের আইনগতভাবে অস্তিত্বের স্বীকৃতি দেওয়া হয়। 

নজরুল বলেন, পৃথিবী জুড়েই এই সমস্যার কথা আমরা জানতে পারছি। তবে সমস্যাটির সাথে সাথে কিছু সামাজিক কুসংস্কার, অজ্ঞতা, অবহেলা এবং অপরাধের প্রবণতাও জড়িয়ে রয়েছে বলে আমরা দেখতে পাই। 

"সময়মতো সমস্যাটি চিহ্নিত করে চিকিৎসা দিয়ে এদেরকে স্বাভাবিক জীবন-যাপনের সুযোগ দেয়ার মাধ্যমে একেকটি জীবনকে স্বাভাবিক করে তোলা সম্ভব। তবে এ জন্য প্রয়োজন পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সহায়তা। কুসংস্কার, অজ্ঞতা, অবহেলা এবং অপরাধ হতে ব্যক্তি, সমাজ তথা জাতিকে সহায়তা করা সম্ভব।"

"হিজড়ারাও আপনার, আমার মতো সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টি, কোন মায়ের গর্ভজাত এবং আমাদেরই কারো ভাই বা বোন। তাই তাদেরকে স্বাভাবিকভাবে গড়ে তোলা এবং সমাজে সম্মানের সাথে বেচে থাকার ব্যবস্থা করা আমাদের সকলেরই দায়িত্ব এবং কর্তব্য," একজন চিকিৎসকের নয় যেনো একজন সমাজসেবকেরও কণ্ঠ ডা. মো. নজরুল ইসলাম আকাশের কণ্ঠে। 

তবে আলাপচারিতায় দ্রুতই চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় ফিরলেন তিনি। বললেন, অন্যান্য রোগ কিংবা শারীরিক সমস্যার মতো হিজড়াও একটি শারীরিক বা এন্ডোক্রাইন সমস্যা, যার চিকিৎসাও চিকিৎসাশাস্ত্রে মোটামুটিভাবে প্রতিষ্ঠিত। সময়মত শনাক্ত করে যথাযথ ও ধারাবাহিক চিকিৎসা দিলে এদের লিঙ্গ পরিচয়ে পরিচিতি করে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব।

শুধু তাই নয়- এরা বৈবাহিক জীবনযাপন এমনকি বংশবৃদ্ধিতে কখনও কখনও সক্ষম হতে পারে। 

নতুন বিষ্ময়কর মন্তব্য করে ফের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যায় ফিরলেন ডা. নজরুল। তিনি বলেন, মানবদেহ ২৩ জোড়া ক্রোমোজমে গঠিত। এর মধ্যে ২২ জোড়া দেহকোষ বা অটোজম এবং ১ জোড়া সেক্স ক্রোমোজম বা লিঙ্গ নির্ধারন ক্রোমোজম। এই ২৩ জোড়া বা ৪৬টি ক্রোমোজমের অর্ধেক মায়ের কাছ থেকে এবং বাকি অর্ধেক বাবার কাছ থেকে আসে। একটি জটিল প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই পৃথকভাবে আসা ক্রোমোজমগুলো একিভূত হয়ে নতুন প্রজন্ম সৃষ্টি করে। সন্তান ছেলে না মেয়ে হবে তা নির্ধারণ হয় বাবার থেকে আসা X বা Y ক্রোমোজমের উপর নির্ভর করে। বিজ্ঞান বা মানুষ এর নিয়ন্ত্রণ করতে অপারগ, সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছায় বাবার সেক্সক্রোমোজম জোড়া (XY) হতে অর্থাৎ X বা Y গর্ভধারণের সময় মায়ের X ক্রোমোজমের সাথে মিলিত হয়। অর্থাৎ মা সব সময়ই এক জোড়া সেক্স ক্রোমোজম XX বহন করে। অতএব, সন্তান ছেলে নাকি মেয়ে হবে তার জন্য মা'র কোনো ভূমিকা নেই। চিকিৎসা বিজ্ঞান নিশ্চিত করেছে- বাবার যে ক্রোমোজমটি ডিম্বানুতে নিষিক্ত হবে তার উপর নির্ভর করে সন্তান ছেলে কিংবা মেয়ে হওয়ার বিষয়টি। 

"মানুষের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো তার লিঙ্গ পরিচয়। একজন শিশু ভূমিষ্ট হওয়ার পর মানুষের সবচেয়ে বড় আগ্রহ থাকে শিশুটি ছেলে না মেয়ে তা জানার, অর্থাৎ তার লিঙ্গ পরিচয়। আর চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে- সন্তান হয় ছেলে নয়তো মেয়েই হবে। এর বাইরে কিছু হওয়ার সুযোগ নেই। যদি হয়েও থাকে- তা স্রেফ লিঙ্গ প্রতিবন্ধীতা। সেই লিঙ্গই যদি ত্রুটিপূর্ণ বা অস্পষ্ট অথবা অনির্ধারিত হয় তাহলে যেমন মা বাবার অতিরিক্ত মানসিক চাপ বাড়ে তেমনি সমাজ সংসারেও এর একটা প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। আমরা সেই অনির্ধারিত অথবা অস্পষ্ট বা ত্রুটিপূর্ণ লিঙ্গের ব্যাপারে কিছুটা আলোকপাত করতে চাই।"

চিকিৎসা বিজ্ঞানের পবিভাষায় লিঙ্গ নির্ধারণের উপাদান গুলো হলো:

এক. ক্রোমোজমের সংখ্যা এবং ধরণ (মানবদেহের মোট ক্রোমোজম সংখ্যা ২৩ জোড়া, ২২ জোড়া দেহবৈশিষ্ট্য এবং ১ জোড়া লিঙ্গ বৈশিষ্ট্য বহন করে, পুরুষের ক্ষেত্রে যা হলো XY এবং মেয়েদের ক্ষেত্রে XX লিঙ্গ নির্ধারণকারী ক্রোমোজন)। 
দুই. লিঙ্গ নিয়ন্ত্রণকারী হরমোন- টেস্টোস্টেরন, ইস্ট্রোজেন, প্রজেস্টেরন ইত্যাদির অসামঞ্জস্যতা।
তিন. জননাঙ্গের শরীর বৃত্ত্বিয় কাঠামো যেমন মেয়েদের ডিম্বাশয়, ডিম্বনালী, জড়ায়ু এবং যোনীপথ আর ছেলেদের অন্ডকোষ এবং শুক্রনালী।
চার. বহিঃলিঙ্গের বৈশিষ্ট্য, যেমন ছেলেদের পুরুষলিঙ্গ, অন্ডকোষ এবং অন্ডথলী আর মেয়েদের যোনীদ্বার যার উপরের দিকে ভগাঙ্কুর, দুই পাশে বিশেষ চামড়ার ভাজ এবং মাঝখানে যোনিমুখ ও মুত্রনালীর ছিদ্র থাকে।
পাঁচ. আনুষঙ্গিক বৈশিষ্ট্যসমূহ যা বয়ঃসন্ধিকালে লিঙ্গ বৈশিষ্ট্যকে আরও প্রকট করে, যেমনঃ মেয়েদের মাসিক শুরু হওয়া, স্তন গঠন, শরীরে চর্বির সুবিন্যাশ এবং তলপেটের লোমের বিশেষ বিন্যাশ। ছেলেদের ক্ষেত্রে দাড়ি-গোফ গজানো, মাংসপেশী সুগঠিত হওয়া, কণ্ঠস্বরের পরিবর্তন, পুরুষাঙ্গ ও অন্ডকোষের স্থুলতা এবং তলপেটের লোম ছেলেদের বিশেষ বৈশিষ্ট্যে বিন্যস্ত হওয়া। 

এটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। যখন সেটা যথাযথভাবে থাকেনা কিংবা বিকশিত হয় না তখনই আমরা তাকে লিঙ্গ প্রতিবন্ধীতা বলি। সাধারণের ভাষায় তারাই অনেকে হয়ে ওঠেন হিজড়া, বলে ডা. নজরুল। তিনি বলেন, লিঙ্গ বিকাশজনিত ত্রুটি (Disorder of Sex Development) বা অস্পষ্ট লিঙ্গ/ দূবোধ্য বা রহস্যময় লিঙ্গ (Ambiguous Genitalia) হলো বেশকিছু বিরল এবং জটিল লিঙ্গ সম্পর্কীয় ত্রুটির সমষ্টি যা প্রজননঅঙ্গ ভিতরে এবং বাহিরে যথাযথভাবে বিকশিত হতে দেয় না। যদি কারো এ ধরনের ত্রুটি দেখা দেয়, তবে মনে করতে হবে তার মধ্যে পুরুষ এবং মহিলা লিঙ্গের মিশ্র বৈশিষ্ট্য থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। কারও কারও সেক্স ক্রোমোজম পুরুষ (XY) অথবা মহিলা (XX) কিন্তু প্রজনন অঙ্গ (Reproductive organ) হতে পারে

- বিপরীত লিঙ্গ বৈশিষ্ট্যের বা
- স্পষ্টভাবে পুরুষ অথবা মহিলার মতো না হওয়া বা
- পুরুষ এবং মহিলার সংমিশ্রিত লিঙ্গ

এই ত্রুটির কারণ এখনও অস্পষ্ট। তবে তা নির্ভর করে লিঙ্গ নির্ধারণের (হরমোনের কার্যক্ষমতা) হরমোন প্রজনন অঙ্গসমূহের উপরে কোন ব্যপ্তিতে/ কিভাবে কাজ করছে তার উপর। 

অনেক ধরনের লিঙ্গ বিকাশজনিত ত্রুটি দেখা যায়। তার মধ্যে যেগুলি সচরাচর দেখা যায় সেগুলি বর্ণনা করা যেতে পারে-

এক. মেয়ের ক্রোমোজম বহনকারী কিন্তু অস্পষ্ট লিঙ্গ বা ছেলের মত বাহ্যিক লিঙ্গ: এদের সেক্স ক্রোমোজম XX এবং জড়ায়ু ও ডিম্বানু স্বাভাবিক কিন্তু তাদের বাহ্যিক জননাঙ্গ মেয়েদের বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত নয়। যেমন, তাদের ভগাঙ্কুর (Clitoris) বড় এবং ছেলেদের লিঙ্গের মত হতে পারে এবং যোনীপথ (Vagina) বন্ধ থাকতে পারে। চিকিৎসাশাস্ত্রে এই অবস্থাকে 46 XX DSD বা Female pseudoharmaphrodite বলা হয়। এই সমস্যার প্রধান কারন হলো Adrenal Gland এর জন্মগত অতিবৃদ্ধি বা hyperplasia, যেখানে Cortisol এবং Aldosterone হরমোন তৈরির জন্য শরীরে যথেষ্ট/ পর্যাপ্ত এনজাইম বা পাচক রসের ঘাটতি থাকে। যার ফলে শরীরে অতিরিক্ত ছেলে হরমোনের (Androgen) আধিক্য দেখা দেয় এবং বাহ্যিকভাবে ছেলে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত লিঙ্গ বহন করে। এর ফলে কখনো কখনো মারাত্মক শারীরিক সমস্যা দেখা দেয়। কিডনি সমস্যা যার অন্যতম। ফলে এর সমাধানে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন হয়ে পড়ে।

দুই. ছেলের ক্রোমোজম বহনকারী কিন্তু বাহ্যিকভাবে মেয়ের লিঙ্গবহনকারী এবং কিছু অভ্যন্তরীন ছেলের জননাঙ্গ বিশিষ্ট: এদের সেক্স ক্রোমোজম XY কিন্তু বহিঃজননাঙ্গ পুরোপুরি মেয়েদের অথবা অস্পষ্ট থাকে। জড়ায়ু কখনো থাকে বা নাও থাকতে পারে কিন্তু অণ্ডকোষ পেটের মধ্যে বা অস্বাভাবিকভাবে তৈরি হয়। চিকিৎসাশাস্ত্রে একে 46 XY DSD বলা হয় (Male pseudoharmaphrodite)। এর অনেকগুলি কারন আছে। তার মধ্যে ছেলে হরমোনের প্রতি শরীরের/ জননাঙ্গের কম আসক্তি (Androgen insensitivity syndrome – AIS) অন্যতম। ফলে বাহ্যিকভাবে লিঙ্গ মেয়েদের মত হয়।

তিন. স্বাভাবিক জননাঙ্গ কিন্তু অস্বাভাবিক লিঙ্গ বিকাশ: কখনও কখনও ক্রোমোজম বৈশিষ্ট্য না হয় XY নতুবা XX। তাদের ক্ষেত্রে একটা X ক্রোমোজম কম (X0) বা বেশি (XXY) হয়। তাদের জননাঙ্গ স্বাভাবিক মেয়ে অথবা ছেলের মত থাকে কিন্তু বয়ঃসন্ধিকালে তাদের লিঙ্গ বৈশিষ্ট্যের বিকাশ হয় না, যেমন: মেয়ে কিন্তু মাসিক শুরু হয় না। চিকিৎসাশাস্ত্রে এই ত্রুটিকে Sex Chromosome DSD বলা হয়।

Sex Chromosome DSD এর মধ্যে এক প্রকার হলো কষরহবভবষঃবৎ ঝুহফৎড়সব, যেখানে ছেলে শিশু একটি অতিরিক্ত X ক্রোমোজম নিয়ে জন্মায় (47XXY)। এক্ষেত্রে তাদের পর্যাপ্ত পরিমান পুরুষ হরমোন বা Testosterone তৈরি হয় না। ফলে তাদের জননাঙ্গ এবং শরীরের অন্যান্য অঙ্গের বিকাশ পুরুষের বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত হয় না এবং প্রজননক্ষমতা স্বাভাবিক থাকে না।

আরেক প্রকার হলো Turner syndrome, যেখানে মেয়ে শিশুর একটি X ক্রোমোজম কম থাকে (45X) এবং আক্রান্ত শিশু এবং মহিলারা সাধারনত প্রজননে অক্ষম এবং স্বাভাবিকের তুলনায় খর্বাকার হয়। 

চার. স্বাভাবিক বহিঃজননাঙ্গ বিশিষ্ট মেয়ে কিন্তু জরায়ু অনুপস্থিত: কিছু কিছু মেয়ে শিশু অসম্পূর্ন বা অনুপস্থিত জরায়ু এবং জড়ায়মুখ যোনীপথের আংশিক অনুপস্থিতি নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। কিন্তু তাদের ডিম্বানু এবং বহিঃজননাঙ্গ স্বাভাবিক থাকে। পাশাপাশি বয়সবৃদ্ধির সাথে সাথে তাদের তলপেটের লোম স্বাভাবিক হতে থাকে। এদেরকে Rokitarsky Syndrome বা MRKH Syndrome বলে। এই সমস্যার কারণ অজানা। তবে এটা স্পষ্টতই ক্রোমোজম সম্বন্ধীয় নয় কারণ তাদের স্বাভাবিক XX ক্রোমোজম থাকে। সাধারনত প্রথম মাসিক শুরু না হওয়া দেখে এদের শনাক্ত করা যায়। যোনীপথ স্বাভাবিকের তুলনায় ছোট হওয়ার কারণে সহবাসও কষ্টদায়ক হয়। জরায়ু না থাকার কারনে এরা গর্ভবতী হতে পারে না।

পাঁচ. ছেলে এবং মেয়ের সমন্বিত বৈশিষ্ট্য বহনকারী: এই ধরনের অতিবিরল বৈশিষ্ট্যের শিশুর ডিম্বাশয় এবং অণ্ডকোষ বা শুক্রাশয় উভয়ই থাকে এবং বহিঃজননাঙ্গ ছেলে অথবা মেয়ে অথবা ছেলে এবং মেয়ের মিশ্র বৈশিষ্ট্যের হয়। চিকিৎসাশাস্ত্রে এদের 46XX – Ovo-testicular DSD বা True harmaphrodite বলে।

দীর্ঘ বক্তব্যের পর থেমে ডা. নজরুল ইসলাম বললেন, প্রকৃতপক্ষ জন্ম পরবর্তী সময়েই এই সমস্যাটি ধরে ফেলা সম্ভব এবং তাতে এর সমাধানও করা সম্ভব। তিনি বলেন, আমরা যদি জন্ম পর্যায়ে এই সমস্যা চিহ্নিত করে চিকিৎসা দেই তাহলে ধীরে ধীরে সমাজ থেকে এই তৃতীয় লিঙ্গ বিষয়ক সামাজিক সঙ্কটটি মুছে ফেলা সম্ভব। 

সেটা কিভাবে? এমন প্রশ্নে ফের ব্যাখ্যায় গেলেন ডা. মো. নজরুল ইসলাম আকাশ। বললেন কয়েকটি বৈশিষ্ট্য থেকে আমরা জন্মের পরপরই শিশুদের এই সমস্যা রয়েছে কিনা তা চিহ্নিত করতে পারি। এগুলো হচ্ছে-

- অন্ডকোষের অনুপস্থিতি
- অস্বাভাবিক বহিঃলিঙ্গ
- খুব ছোট পুরুষ লিঙ্গ
- লম্বা ভগাঙ্কুর

এছাড়া আরও একটি বিষয় আমরা এ ধরনের শিশুর ক্ষেত্রে লক্ষ্য করেছি। তা হচ্ছে- জন্মের পরপর অস্বাভাবিক ও অবিরাম বমি। এসব ক্ষেত্রে আমরা দেখেছি অধিকাংশ শিশু লিঙ্গজনিত কোনও জটিলতায় ভুগলেই এমন অনবরত বমি করতে থাকে। 

দ্বিতীয় যে সময়টিতে বিষয়টি স্পষ্ট হয় তা হচ্ছে বয়সন্ধিকাল। এই সময়ে ছেলে কিংবা মেয়েদের লিঙ্গের স্বাভাবিক পরিবর্তন এবং অন্যান্য লিঙ্গ বৈশিষ্ট্যের স্বাভাবিক বিকাশ না হলে তা থেকে ধরে নিতে হয় ছেলে কিংবা মেয়েটি কোনো ধরনের লিঙ্গ প্রতিবন্ধীতায় ভুগছে, বলেন ডা. নজরুল। 

লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে মেয়েদের ক্ষেত্রে মাসিক না হওয়া, স্তনের গঠন না হওয়া, কন্ঠস্বরের অস্বাভাবিক পরিবর্তন, দাঁড়িগোফ গজানো ইত্যাদি। আর ছেলেদের ক্ষেত্রে পুরুষাঙ্গ বড় না হওয়া, দাড়ি-গোফ না গজানো, কন্ঠস্বর এবং পেশীর স্বাভাবিক পরিবর্তন পরিবর্তন না হওয়া ইত্যাদি।

তা হলে করণীয় কি? এমন প্রশ্নে ডা. নজরুল বলেন, খুব সহজ কিছু সার্জারি। কিন্তু সবার আগে দরকার সচেতনতা। নবজাতকের জন্মের পর শিশুর যত্নের পাশাপাশি মা, বাবা ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যদেরকে উপরোক্ত সমস্যাগুলি খেয়াল করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নেওয়ার উদ্যোগটি নিতে হবে। তাদের প্রথমেই নিশ্চিত করে নিতে হবে সন্তানটি কোন লিঙ্গের। আর লিঙ্গ নির্ধারনের জন্য চিকিৎসকের পরামর্শক্রমে Karryotyping ক্যারিওটাইপিং নামে একটি জেনেটিক টেস্ট করিয়ে নিতে হবে। আল্ট্রাসোনোগ্রাম করতে হবে। তার মাধ্যমে চিকিৎসকরা সহজেই বলে দিতে পারবেন শিশুটি মূলত কোন লিঙ্গের। আর একবার নির্ধারন করে নিলে এরপর ধারাবাহিক চিকিৎসা। ছোটখাটো কিছু সার্জারি করে দিতে হয়। এতে ছেলেটি ছেলে ও মেয়েটি মেয়ে হিসেবে বড় হতে পারে। 

সাফল্যের মাত্রা কত? এমন প্রশ্নে এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বললেন, প্রায় শতভাগ। তবে শিশু বয়সে চিকিৎসা শুরু করতে পারলে সাফল্য নিয়ে সন্দেহমাত্র নেই। 

নিজের অভিজ্ঞতা ও সাফল্যের গল্পগুলো শোনালেন, ছবি দেখালেন নারী হিসেবে বড় হয়ে ওঠা একজনকে চিকিৎসা ও অস্ত্রপোচারে কি করে পুরুষ করে তোলা হয়েছে। এবং এখন তিনি সুখি বৈবাহিক জীবন পার করছেন। 

একজন কনফিডেন্ট ডা. মো. নজরুল ইসলাম আকাশের উচ্চারণ, এটা নিয়ে সামাজিক মিথ ভেঙ্গে বাবা-মায়েরা যত বেশি করে সন্তানের চিকিৎসার আওতায় নিয়ে আসবেন, ততই দ্রুত সমাজ থেকে এই বিশেষ সঙ্কটটির অবসান ঘটবে। 

Dutch-Bangla Bank
TELETALK
বিশেষ সংবাদ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত