বুধবার   ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২১ || ১৪ আশ্বিন ১৪২৮ || ১৯ সফর ১৪৪৩

অপরাজেয় বাংলা :: Aparajeo Bangla

বাংলাদেশে করোনার আদ্যোপান্ত নিয়ে গবেষণা আইসিডিডিআর,বি’র

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট

১৭:৪৫, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২১

আপডেট: ১৮:২৭, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২১

২৯২

বাংলাদেশে করোনার আদ্যোপান্ত নিয়ে গবেষণা আইসিডিডিআর,বি’র

সম্প্রতি, রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর), আইসিডিডিআর,বি এবং আইদেশি-সহ দেশি বিদেশী প্রতিষ্ঠান মিলে একটি জিনোমিক কনসোর্টিয়ামের আওতায় বাংলাদেশে করোনাভাইরাস-এর প্রবেশ, দেশব্যাপী বিস্তৃতি এবং করোনাভাইরাস বিস্তার প্রতিরোধে বিভিন্ন সময়ে লকডাউন এবং জনসাধারণের গতিবিধির ভূমিকার ওপর ভিত্তি করে একটি বিশ্লেষণধর্মী গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছেন।

গবেষণাপত্রটি ৪ সেপ্টেম্বর স্বনামধন্য নেচার সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়। গবেষণাটিতে বাংলাদেশে প্রথম করোনাভাইরাস-এর উদ্ভব, দেশব্যাপী করোনাভাইরাস বিস্তারে লকডাউন এর পূর্ববর্তী এবং পরবর্তী সময়ে জনসাধারণের চলাচলের ভূমিকা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

আইইডিসিআর, আইসিডিডিআরবি, আইদেশি, বাংলাদেশ সরকারের এটুআই প্রোগ্রাম, যুক্তরাজ্য ভিত্তিক স্যাঙ্গার জিনোমিক ইনস্টিটিউট, হার্ভার্ড স্কুল অব পাবলিক হেলথ, এবং ইউনিভার্সিটি অব বাথ এর বিজ্ঞানীদের যৌথ উদ্যোগে ২০২০ সালের মার্চ মাসে এই গবেষণাটি শুরু হয়। 

প্রাথমিকভাবে মার্চ-জুলাই ২০২০ অন্তর্বর্তীকালে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে সংগৃহীত ৩৯১টি করোনাভাইরাস এর জিনোম বিশ্লেষণ করা হয়। বিশ্লেষণ থেকে দেখা যায়, বাংলাদেশে প্রথম করোনাভাইরাস-এর সম্ভাব্য উদ্ভব হয় ২০২০ সালে, ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি সমযয়ে এবং পরবর্তীতে আভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলের মাধ্যমে আরও ভাইরাসের অনুপ্রবেশ ঘটে।

বাংলাদেশে প্রথম করোনাভাইরাস শনাক্ত হয় ৮ মার্চ ২০২০ সালে। বিস্তার প্রতিরোধে বাংলাদেশ সরকার মার্চ মাসের ২৩ তারিখে ২৬ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত দেশব্যাপী সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে। বাংলাদেশ সরকারের এটুআই প্রোপ্রাম থেকে সংগৃহীত ফেসবুক এবং মোবাইল ফোন অপারেটরদের তথ্য অনুযায়ী এই অন্তর্বর্তীকালীন মার্চ ২৩ থেকে ২৬ তারিখের মধ্যে জনসাধারণের ঢাকা ত্যাগ করার প্রাপ্ত ডাটার সাথে সার্স-কোভ-২ জিনগত বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে, মার্চ ২৩ থেকে ২৬ তারিখের মধ্যে ঢাকা বহির্মুখী যাতায়াতই মূলত দেশব্যাপী করোনাভাইরাস বিস্তারের প্রাথমিক কারণ।

পরবর্তীতে, নভেম্বর ২০২০ থেকে এপ্রিল ২০২১ এর মধ্যে সংগৃহীত আরও ৮৫টি সার্স-কোভ-২ নমুনা সংগ্রহ করে। এর মধ্যে ৩০টি ছিল লিনিয়েজ বি.১.১.২৫ (৩৫%), ১৩ টি ছিল আলফা ভ্যারিয়েন্ট (বি.১.১.৭, ১৫%), ৪০ টি ছিল বিটা ভ্যারিয়েন্ট (বি.১.৩৫১,৪৭%), ১ টি ছিল লিনিয়েজ বি.১.১.৩১৫, এবং ১ টি ছিল লিনিয়েজ বি.১.৫২৫। প্রথম ঢেউ-এ করোনাভাইরাসের বিস্তারের কারণগুলোর ওপর ভিত্তি করে ভাইরাসের বিস্তার রোধে বাংলাদেশ সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেন যেমন এক জেলা থেকে অন্য জেলায় ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা আরোপ। 

আইইডিসিআর-এর পরিচালক অধ্যাপক তাহমিনা শিরীন বলেন, “আমাদের এই কনসোর্টিয়াম বিভিন্ন সময়ে নীতিনির্ধারকদেরকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদান করে সহায়তা করে থাকে। এর মধ্যে রয়েছে সীমান্তবর্তী এলাকাতে জনসাধারণের চলাচল নিষিদ্ধ করা, পরিবহন এবং যানবাহন চলাচলে সীমাবদ্ধতা আনা, বাধ্যতামূলক কোয়ারেন্টাইন এবং যেসব দেশে উদ্বেগজনক ভেরিয়েন্ট ছিল সেখান থেকে আগত ভ্রমণকারীদের সাধারন মানুষদের থেকে আলাদা রাখা, সময়মতো লকডাউন সিদ্ধান্ত বা প্রয়োজনবোধে আন্তর্জাতিক চলাচল সীমাবদ্ধ করা। আমাদের এই কনসোর্টিয়াাম গত বছরের মার্চ মাস থেকে একত্রে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। আমাদের এই কাজ চলমান থাকবে এবং এবং এর মাধ্যমে আমরা আমাদের নীতিনির্ধারকদের জন্য কোভিড-১৯ এর বিস্তার ঠেকাতে প্রয়োজনীয় প্রমাণ-ভিত্তিক তথ্য সরবরাহ করতে পারবো।”

এই গবেষণাপত্রটির মূল-লেখকদের একজন ডক্টর লরেন কাউলি বলেন, “জেনোমিক এবং মবিলিটি ঢাকা থেকে বিভিন্ন ডাটা স্ট্রিম একত্রিত করে আমরা কিভাবে করোনাভাইরাস বাংলাদেশের ছড়িয়ে পড়েছিল তা বিশ্লেষণ করতে সক্ষম হয়েছি। এই গবেষণাটিতে মহামারী প্রতিরোধে জিনোম সিকোয়েন্সিং-এর কার্যকারিতা দেখানো হয়েছে যা ভবিষ্যতে অন্যান্য মহামারীর ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা সম্ভব হবে।” 

যুক্তরাজ্য ভিত্তিক ওয়েলকাম স্যাঙ্গার ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক নিকোলাস থমসন বলেন, “আমরা বহু বছর ধরেই বিভিন্ন সংক্রামক রোগের ওপর একসাথে কাজ করছি। বিজ্ঞানীরা যখন জনস্বাস্থ্য পেশাজীবীদের সাথে যৌথভাবে একটি লক্ষ্যকে সামনে রেখে কাজ করেন তখন কতটা সাফল্য অর্জন করা যায় এই গবেষণাপত্রটি তারই একটি বাস্তব উদাহরণ।”

হার্ভার্ড স্কুল অব পাবলিক হেলথ-এর অধ্যাপক ক্যারোলিন বাকি বলেন,    “মবিলিটি ডাটা, প্রথাগত চলমান সার্ভেলেন্স সিস্টেমের সাথে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। এই গবেষণায় দেখানো হয়েছে, এধরনের একটি মিলিত বিশ্লেষণধর্মী গবেষণা থেকে প্রাপ্ত তথ্যাদি একটি দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে কতটা মূল্যবান ভূমিকা রাখতে পারে, যা অন্য কোনো উপায়ে অর্জন করা কঠিন। এই ধরনের গবেষণা শুধুমাত্র চলমান করোনাভাইরাস মহামারীর ক্ষেত্রেই নয়, ভবিষ্যতের যে কোনো মহামারী প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম।”

আইসিডিডিআর,বি-র জেষ্ঠ্য বিজ্ঞানী এবং এই গবেষণা নেতৃত্ব প্রদানকারীদের একজন ডক্টর ফেরদৌসী কাদরী বলেন, “অনেক প্রতিকূলতা এবং লকডাউনের সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও আমার সহকর্মীদের নিরলস প্রচেষ্টা এবং আন্তর্জাতিক কোলাবোরেটরদের সহযোগিতায় আমরা সব প্রতিকূলতা কাটিয়ে উঠতে পেরেছি। আমাদের দায়িত্ব এই গবেষণাতেই সীমাবদ্ধ নয়। পুরো পৃথিবী জুড়েই বিভিন্ন দেশে কয়েক মাস পর মিউটেশনের মাধ্যমে নতুন ভেরিয়েন্ট তৈরি হচ্ছে এবং এর মধ্যে কিছু ভেরিয়েন্ট ভ্যাকসিন এর কার্যকারিতা কমিয়ে দিতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। বাংলাদেশ সরকার চেষ্টা করছে দেশের সব মানুষকে টিকার আওতায় নিয়ে আসার। এই টিকাগুলোর কার্যকারিতা বোঝার জন্য আমাদেরকে এধরনের কাজ অব্যাহত রেখে সরকারকে সময়মতো সঠিক তথ্য দিয়ে প্রযয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করতে হবে।”

এই গবেষণায় ফেসবুক ডেটা ফর গুড, গ্রামীণফোন, বাংলালিংক, রবি আজিয়াটা লিমিটেড জনসংখ্যা মোবিলিটির তথ্য সরবরাহ করেছে। বিল এবং মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, বাংলাদেশ সার্স-কোভ -২ নমুনার সিকোয়েন্সিং-এ সহায়তা করেছে।

DBBL Agent Banking Cash In Cash Out
স্পটলাইট বিভাগের সর্বাধিক পঠিত