রোববার   ২০ জুন ২০২১ || ৬ আষাঢ় ১৪২৮ || ০৮ জ্বিলকদ ১৪৪২

অপরাজেয় বাংলা :: Aparajeo Bangla

স্মরণে সত্যজিৎ

সঙ্গীতা ইমাম

২৩:৫৮, ১ মে ২০২১

আপডেট: ১৪:১৭, ২ মে ২০২১

২৩৫৮

স্মরণে সত্যজিৎ

সেই কবে পড়েছিলাম তাঁর লেখা যখন ছোট ছিলাম বইটি। তখনও বিজয়া রায়ের অনুবাদে পেঙ্গুইন থেকে বইটির ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশিত হয়নি। কিন্তু আমার কৈশোরকে কেমন রাঙিয়ে তুলেছিল সত্যজিৎ রায়ের কৈশোর। উপেন্দ্রিকিশোর রায়ের পৌত্র আর সুকুমার রায়ের সন্তান এভাবেই শিশু-কিশোরের মনস্তত্ত্বে আবীর মাখাবেন- এ আর নতুন কী? যখন পরিচিত হচ্ছিলাম সত্যজিৎ রায়ের ছেলেবেলার সঙ্গে, তখন তো আমাদের ছেলেবেলা মাতিয়ে রেখেছিলেন সুকুমার রায়ের আবোল তাবোল, হ-য-ব-র-ল বা পাগলা দাশু। উপেন্দ্রকিশোর থেকে সত্যজিৎ রায়, আমাদের পুরোটা শৈশব-কৈশোর-তারুণ্যজুড়ে সমগ্র সময়কে আজও ধরে রেখেছেন কী নিপুন শৈলীতে।

বাঙালির বাড়িতে গীতবিতান, সঞ্চয়িতা বা সঞ্চিতা যেমন থাকে, তেমনি থাকত সুকুমারসমগ্র আর সত্যজিতের সৃষ্টি ফেলুদা, প্রোফেসার শঙ্কু আর তারিণীখুড়ো। ফেলুদা তো অতি অবশ্যই। আর তাঁর গল্পের মধ্যে ধাঁধার যে খেলা, সেটা সমাধান করতে করতেই আমাদের ছেলেবেলা কেটেছে। তাঁর চলচ্চিচত্রের কাছে শুধু বাঙালি কেনো- গোটা পৃথিবীরই অনেক ঋণ। আমি চলচ্চিত্রবোদ্ধা নই, কিন্তু তাঁর চলচ্চিত্রের মধ্য দিয়ে বাঙালি জীবনের যে দ্বন্দ্ব-টানাপোড়েন আর চিন্তাধারার বিকাশ দেখেছি, সে তো আমাদের ঋদ্ধ করেছে। 

আজ তার জন্মশতবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় স্মরণ করি সত্যজিৎ রায়কে। আমাদের শৈশব কৈশোরের নায়কের তিনিই তো স্রষ্টা। তাঁর কলমের ছোঁয়ায় রোমাঞ্চিত হয়েছি বারবার, এখনও হই। ফেলুদাই তো আমার সেই নায়ক। ফেলুদার স্রষ্টা সত্যজিৎ রায় এমনই এক সব্যসাচী, যিনি একাধারে লেখক চলচ্চিত্রকার চিত্রশিল্পী সঙ্গীতকার... সত্যি বলতে কী নন তিনি! এই সব্যসাচী স্রষ্টার আজ জন্মদিন। ১৯২১ সালের ২ মে তাঁর জন্ম।

আমার আব্বু সৈয়দ হাসান ইমামের সঙ্গে কর্মসূত্রে সত্যজিৎ রায়ের ভালো যোগাযোগ ছিল। এক সময় সত্যজিৎ রায় আব্বুকে ঘরে বাইরে চলচ্চিত্রের মূল চরিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাবও দিয়েছিলেন। সে সময় ঘরে বাইরে সিনেমাটি তৈরি না হওয়ায় আব্বুরও বয়স বেড়ে গেল, আর অভিনয় করা হলো না এই বিশ্বখ্যাত চলচ্চিত্রনির্মাতার চলচ্চিত্রে। পরে অবশ্য আব্বু সত্যজিৎতনয় সন্দ্বীপ রায়ের টিনটোরেটার যীশু ছবিতে অভিনয় করেছিলেন ২০০৮ সালে। ডিরেকশনে না হলেও গল্প তো সত্যজিৎ রায়েরই।

আরও পড়ুন: ২ মে সত্যজিৎ জন্মশতবর্ষে অন্তর্জাল আলাপন অপরাজেয় বাংলা`য়

একবার ভারতে বেড়াতে গিয়ে আমার আবদার ছিল সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে দেখা করবো। আব্বু রাজি হয়ে একটা সময় নিলেন তাঁর কাছ থেকে। আমরা তিন ভাইবোন আর আব্বু-আম্মু রওয়ানা হই। সেটা ১৯৮২ সাল। তখন কোলকাতায় প্রচণ্ড জ্যাম হতো, বিশেষত বিকেলে, অফিস ছুটির সময়। আমাদের পৌঁছানোর কথা সাড়ে ছয়টায়। পথে জ্যাম দেখে ট্যাক্সি ছেড়ে হাঁটতে শুরু করি। হাঁটা কী, প্রায় দৌড়ে সময়টা রাখতে পারি অবশেষে। বিশাল বাড়ির তিনতলায় উঠে বিশাল সাদা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ডোরবেল বাজাতে দরজা খুলে দেন দরজার মতনই বিশাল এক মানুষ। ঘাড় উঁচু করে দেখে মন আনন্দে ভরে যায়। এই তো সেই স্বপ্নের মানুষ- সত্যজিৎ রায়।

উনি হেসে বলেন, এসো এসো, তোমাদের জন্যই অপেক্ষা করছি। আব্বুর নির্দেশে আমরা পা ছুঁয়ে প্রণাম করলাম। তারপর বসার ঘর পেরিয়ে স্টাডিতে নিয়ে যান আমাদের। আমাদের বসতে বলে ঘরের ভেতরে যান। তখন আমরা ঘুরে ঘুরে বই দেখি। কত কত বই।

ফিরে এসে ইজিচেয়ারে বসেন, যার সামনে একটি ছোট ইজেলে অসমাপ্ত একটি ছবি। পাশে রাখা স্কেচ পেন্সিলসহ যাবতীয় আঁকার জিনিস। ইজিচেয়ারের হাতলে একটা ওয়াকম্যানে হেডফোন লাগানো। ইজিচেয়ারে বসে আমাদেরকে নানা প্রশ্ন করলেন। কী করি, কোন ধরনের বই পড়তে ভালো লাগে... আরও অনেক কথা!

আমি তো এতটাই অভিভূত যে ভালো করে সব কথার উত্তরও দিতে পারছিলাম না। শুধু খুব নিচু স্বরে বলতে পেরেছিলাম ফেলুদা সিরিজ আমার সবচেয়ে প্রিয়। আর তাঁর ছেলেবেলার স্মৃতিকথা যখন ছোট ছিলাম বইটি পড়েছি। বলা হলো না প্রোফেসার শঙ্কু একটু খটোমটো লাগে। গুপী গাইন বাঘা বাইন বহুবার দেখা। গানগুলো একদম মুখস্থ। ততদিনে পথের পাঁচালী, অপরাজিত আর অপুর সংসার দেখা হয়ে গেছে। ছোটো ভাই স্বাক্ষর চটপট উত্তর দিতে লাগলো সব। স্বাক্ষর ছন্দে ছন্দে হীরক রাজার দেশের সংলাপ বলতে শুরু করলে তিনি বেশ উপভোগ করেন। আমরা তিন ভাইবোন অটোগ্রাফ নিলাম। আমাদের একটা ফেলুদার বই দিলেন সই করে। তারপর আব্বুর সাথে ফিল্মের কথা বললেন। এর মধ্যেই বিজয়া রায় এলেন সাথে চা নাস্তা নিয়ে। আম্মুর সাথে গল্প করলেন অনেকক্ষণ।
 
আব্বু আমাদের একটা ছবি তুলে দিলেন। আমরা বেরিয়ে এলাম জীবনের ঋদ্ধতম অনুভূতি নিয়ে। আজ তাঁর জন্মশতবার্ষিকী। শুভ জন্মদিন বিস্ময় মানুষ। আপনার সৃষ্টি আপনাকে স্মরণীয় করে রাখবে অনন্ত কাল। স্মরণে শ্রদ্ধা।

সঙ্গীতা ইমাম: লেখক, শিক্ষক ও সংস্কৃতিকর্মী।

Dutch-Bangla Bank
TELETALK