রোববার   ২০ জুন ২০২১ || ৬ আষাঢ় ১৪২৮ || ০৮ জ্বিলকদ ১৪৪২

অপরাজেয় বাংলা :: Aparajeo Bangla

মিনা পাল থেকে ‘কবরী’ রূপে আত্মপ্রকাশের গল্প

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট

০১:৪৮, ১৭ এপ্রিল ২০২১

আপডেট: ১০:৪৬, ১৭ এপ্রিল ২০২১

১০৩১

মিনা পাল থেকে ‘কবরী’ রূপে আত্মপ্রকাশের গল্প

কবরীকে বলা হয় বাংলা চলচ্চিত্রের মিষ্টি মেয়ে
কবরীকে বলা হয় বাংলা চলচ্চিত্রের মিষ্টি মেয়ে

ষাটের দশকে প্রথম ছবি 'সুতরাং' দিয়েই দর্শক হৃদয় হরণ করেছিল মিষ্টি মেয়েটি। এরপর ছবির পর ছবিতে দিগ্বিজয়ের পালা। চলচ্চিত্রে তার অর্ধশতককালের আশ্চর্য সফলতার গল্প—অভিনয়ে, প্রযোজনায়, পরিচালনায়। চলচ্চিত্রাঙ্গন থেকে রাজনীতির আঙিনায় এসে হয়েছিলেন সাংসদ। সবখানেই জয়জয়কার। 

১৯৫০ সালের ১৯ জুলাই চট্টগ্রামের বোয়ালখালীতে জন্ম নেওয়া এই কিংবদন্তীর শৈশব ও কৈশোর কেটেছে চট্টগ্রামের ফিরিঙ্গি বাজারে। বাবা শ্রীকৃষ্ণ দাস পাল এবং মা শ্রীমতি লাবণ্য প্রভা পাল৷ ১৯৬৩ সালে ১৩ বছর বয়সে নৃত্যশিল্পী হিসেবে তার মঞ্চে ওঠা তারপর টেলিভিশনেও কিছুদিন কাজ করা।

ফিরিঙ্গি বাজারের কিশোরী মিনা পালের স্বপ্ন ছিল বড় হয়ে সাদা শাড়ি পরে কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে স্কুলে মাস্টারি করবে। কিন্তু 'লাইট, ক্যামেরা-অ্যাকশন-কাটের' সঙ্গে জীবন জড়িয়ে যায় হঠাৎই, পরিচালক সুভাষ দত্তের দৌলতে। 

কবরীকে বলা হয় বাংলা চলচ্চিত্রের মিষ্টি মেয়ে। রোমান্টিক অভিনয়ে তার জুড়ি ছিল না। তার ভুবন ভোলানো হাসি আর হৃদয়ছোঁয়া অভিনয়ে মুগ্ধ সব বয়সী দর্শক।কবরী বলেছিলেন, তিনি গুরু মানতেন সুভাষ দত্তকে। আর স্বনামধন্য পরিচালক জহির রায়হান তাকে শিখিয়েছিলেন সিনেমাকে ভালোবাসতে। 

বাংলা চলচ্চিত্রে মিনা পালের 'কবরী' রূপে আত্মপ্রকাশ ষাটের দশকে। রূপালী পর্দার এই নামটি সুভাষ দত্তেরই দেওয়া। অভিষেক সাল ১৯৬৪। সুতরাং'-এ বাজিমাৎ এর পর  থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত টানা ছয় বছরে 'জলছবি', 'বাহানা' 'সাত ভাই চম্পা', 'আবির্ভাব', 'বাঁশরি', 'যে আগুনে পুড়ি', 'দীপ নেভে নাই', 'দর্পচূর্ণ', 'ক খ গ ঘ ঙ', 'বিনিময়সহ আরও কিছু সিনেমায় একচ্ছত্র আধিপত্য এবং দর্শককে তুমুল ভালোলাগায় মাতিয়ে রাখা।

ষাটের মাঝামাঝি থেকে সত্তরের দশকে এই সিনেমাগুলোই কবরীকে সিনেমা জগতে প্রতিষ্ঠিত করলেও ৭৫' এ তাকে তুমুল জনপ্রিয়তা এনে দেয় 'সুজনসখী' এবং পরবর্তীতে 'সারেং বউ'। এই দুই সিনেমায় নায়ক ফারুকের সঙ্গে কবরীর জুটি ছাড়িয়ে যায় আগের সমস্ত জনপ্রিয়তাকে। 

এছাড়াও দীর্ঘ তিন দশকের ক্যারিয়ারে 'নীল আকাশের নিচে', 'ময়নামতি', ‘স্মৃতিটুকু থাক’, ‘সারেং বউ’, 'দেবদাস'সহ শতাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি। এসবের মধ্যে ১৯৭৩ সালে ঋত্বিক ঘটক পরিচালিত ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ উল্লেখযোগ্য।

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে প্রথমে ঢাকা ছাড়তে হয় এই অভিনেত্রীকে, এর পরের ঠিকানা ভারত। কলকাতায় বাংলাদেশের পক্ষে জনমত সৃষ্টি করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি। বিভিন্ন সভা-সমিতি ও অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন, আয়োজন করেন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের, উদ্বুদ্ধ করে মুক্তিসেনাদের। স্বাধীনতার পরে দেশে ফিরে চলচ্চিত্রে পুরোপুরি মনোনিবেশ করেন। উপহার দেন একের পর এক কালজয়ী চলচ্চিত্র।

প্রায় ৫৫ বছরের বেশি সময় চলচ্চিত্রে রাজ্জাক, ফারুক, সোহেল রানা, উজ্জ্বল, জাফর ইকবাল ও বুলবুল আহমেদের মতো অভিনেতাদের সঙ্গে কাজ করেছেন তিনি। ঢাকার চলচ্চিত্র ইতিহাসের অন্যতম জনপ্রিয় জুটি ছিলেন রাজ্জাক-কবরী। 

অভিনয়ের পাশাপাশি ২০০৬ সালে ‘আয়না’ নামে একটি চলচ্চিত্রের পরিচালনার মধ্য দিয়ে নির্মাণে অভিষেক ঘটে কবরীর। ওই ছবির একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে তিনি অভিনয়ও করেছিলেন।

লেখালেখিও করতেন কবরী।তার আত্মজীবনীমূলক বই ‘স্মৃতিটুকু থাক’ ২০১৭-তে একুশে গ্রন্থমেলা প্রকাশিত হয়েছে। লেখনিতে প্রশংসাও কুড়িয়েছে বইটি।

অভিনয়ের জন্য পেয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, মেরিল-প্রথম আলো আজীবন সম্মাননাসহ বহু পুরস্কার ও সম্মাননা।

নারায়ণগঞ্জের ব্যবসায়ী শফিউদ্দিন সারওয়ারের সঙ্গে বিয়ের পর কবরী সারওয়ার নামে পরিচিতি হয় তার। জন্ম দেন পাঁচ সন্তানের। ২০০৮ সালে তাদের বিয়েবিচ্ছেদ হয়। এরপর নাম ও পরিচিতি স্থায়ী হয় সারাহ বেগম কবরী হিসেবে। 

নিজেকে শুধু সেলুলয়েডে বন্দী করে রাখেননি তিনি। রাজনীতিতেও জড়িয়েছেন। ২০০৮ সালে নবম সংসদে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে আওয়ামী লীগ থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। যুক্ত থেকেছেন অসংখ্য নারী অধিকার ও সমাজসেবামূলক সংগঠনের সঙ্গে।

পাঁচ সন্তানের এই জননী চাইতেন উদ্ভাবনের মধ্য দিয়ে বেঁচে থাকতে এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কাজ করে যেতে। তার আশা-আকাঙ্ক্ষা, পাওয়া না-পাওয়া—সবটা ছিল সিনেমাজুড়েই। সম্প্রতি কবরী শুটিং শেষ করেছেন ‘এই তুমি সেই তুমি’ সিনেমার। সিনেমাটি পরিচালনার পাশাপাশি এর কাহিনী, চিত্রনাট্য ও সংলাপ রচনা করেছেন তিনি। 

সরকারি অনুদানের এই ছবির ডাবিং ও সম্পাদনার কাজ চলছিল। কিন্তু মানুষের সব কাজতো পূর্ণতা পায়না। ঢাকাই চলচ্চিত্রের সোনালী অতীত ফিরে আসুক, শেষ পর্যন্ত তার এই প্রত্যাশা ছিল। জীবনের নানান চড়াই-উৎরাই পাড়ি দিয়ে এলেও হার মানতে হলো মহামারির কাছে।

তার মৃত্যুতে ঝরে পড়লো বাংলা সিনেমার আরেকটি নক্ষত্র। নীল আকাশের নীচে সবাইকে রেখে তিনি চলে গেলেন অনন্তলোকে, রয়ে গেল শুধু অসংখ্য স্মৃতি আর অসামান্য সব সৃষ্টি।

Dutch-Bangla Bank
TELETALK