বৃহস্পতিবার   ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ || ১৭ ফাল্গুন ১৪৩০ || ১৭ শা'বান ১৪৪৫

অপরাজেয় বাংলা :: Aparajeo Bangla

ব্রাহ্মণবাড়িয়া কি সত্যিই ভয়ের জনপদ? নাকি মিডিয়া ট্রেন্ড ট্রল-কালচারের শিকার?

রাজীব নন্দী, শিক্ষক ও গবেষক

১১:১৩, ৬ আগস্ট ২০২১

আপডেট: ১১:২৮, ৬ আগস্ট ২০২১

৩৩০৫

ব্রাহ্মণবাড়িয়া কি সত্যিই ভয়ের জনপদ? নাকি মিডিয়া ট্রেন্ড ট্রল-কালচারের শিকার?

ব্রাহ্মণবাড়িয়া কি সত্যিই ভয়ের জনপদ? নাকি ট্রল-কালচারের শিকার?
ব্রাহ্মণবাড়িয়া কি সত্যিই ভয়ের জনপদ? নাকি ট্রল-কালচারের শিকার?

কথা হচ্ছিলো হাস্যোচ্ছ্বলে। বাংলাদেশের স্বনামধন্য একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ শিক্ষকের সঙ্গে। যার বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া। তিতাস-বিধৌত ভূমিপুত্র আমার সেই সহকর্মী ফেসবুকে আমার ওপর তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠলেন। কারণ, আমি তার এলাকা ব্রাহ্মণবাড়িয়া নিয়ে ফেসবুকে ‘রসিকতা’ করেছি। পরে কিছুটা শীতল হয়ে তিনি শ্রীমতি রাধারাণীর মতো অনুরাগ করে বললেন, ‘সংঘর্ষ কোথায় হয়না বাংলাদেশের? আপনার চট্টগ্রামে কি হয় না? কেবল ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সংঘর্ষ কেন মিডিয়া হাইপ তুলে?’ আমি তার কথায় যথেষ্ট গুরুত্ব দিলাম। তবে ফেসবুকে তার ‘মানভঞ্জন’ না করে, বাহ্মণবাড়িয়া নিয়ে ছোট্ট একটি নিরীক্ষাধর্মী কাজে হাত দিলাম। সাথে যুক্ত হলো আমার ৫ জন শিক্ষার্থী, যাদের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া এবং করোনাকালে যারা ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় অবস্থান করছেন। গণমাধ্যমের ভোক্তা ও শ্রোতা হিসেবে আমরা ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে একটি ‘সহিংস জনপদ’ হিসেবে দেখে আসছি বেশ কয়েকবছর ধরে। কিন্তু ‘ক্রিটিক্যাল মিডিয়া অবজারভেশন’-এ আমি ভিন্ন এক ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে আবিস্কার করতে থাকলাম। গবেষণাকর্ম চলার মাঝপাথে ভয়াবহ আশ্চর্য হওয়ার পর এই লেখার অবতারণা। 

বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতিতে সহিংসতা নতুন কোন বিষয় নয়। ১৯৭১ সালে একটি রক্তপ্লাবি সহিংস যুদ্ধের মধ্য দিয়ে জন্ম নেয় এই জাতি, যার রাজনৈতিক ইতিহাসে ‘সহিংসতা’ নামক প্রপঞ্চটি নানা মাত্রায় ঘুরে ফিরে প্রভাব রেখেছে। মাত্রা ও প্রভাবগত কারণে সামাজিক সহিংসতা বাংলাদেশের আত্মপরিচয়ের সাথে অঙ্গাগীভাবে যুক্ত। সেই বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ জেলার নাম ব্রাহ্মণবাড়িয়া। নদীমাতৃক বাংলাদেশের মধ্য-পূর্বাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী তিতাস-বিধৌত জেলা ব্রাহ্মণবাড়িয়া। এই স্থানকে বলা হয় বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক রাজধানী। কিন্তু ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে ঘিরে একাধিক সহিংস ঘটনায় সমাজে নানান মিথস্ক্রিয়া লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সহিংস সংবাদগুলোর টিভি সংবাদ প্রচারের পর অনলাইন পোর্টালে ‘ট্রল’-এ পরিণত হচ্ছে। এছাড়াও গত ৫ বছরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সংঘটিত গণপিটুনি, থানা লুট, টেটা যুদ্ধ, ইসলামি উগ্রপন্থি রাজনৈতিক সহিংসতা, হিন্দু মন্দির আক্রমন, করোনাকালে লকডাউন অমান্য করে লাখো মানুষের জানাজা আয়োজন, ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফরকে ঘিরে সংঘর্ষ, কোপা আমেরিকার ফুটবল ম্যাচের ফাইনাল খেলায় ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে প্রাণহানিসহ নানান ‘তুচ্ছ’ ঘটনায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া ‘সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম’-এ (ফেসবুক ও ইউটিউবে) ‘ট্রল কনটেন্ট’ এর আধারে পরিণত হয়েছে। এমন অবস্থায় আমরা গবেষকদল সমাজ অনুসন্ধিৎসু মানসিকতা থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া নিয়ে একটি সামাজিক, রাজনৈতিক গুণগত গবেষণা পরিচালনা করার তাগাদা বোধ করি। বিশেষ করে এই জেলার সরাইল, নবীনগর, নাসিরনগর এসব স্থানে সংগঠিত উল্লেখযোগ্য ১০টি সামাজিক সহিংসতার স্বরূপ অনুসন্ধান করতে নামি আমরা। কারণ, এসব সহিংসতার খবর মিডিয়াতে এমনভাবে পরিবেশন হয়েছে, যার ফলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার একটি ‘সহিংস’ ইমেজ নির্মাণ করেছে মিডিয়া। মিডিয়ার জ্বলন্ত উনুনের সেই সব সংবাদগুলো ফেসবুক নামক তেলে পড়ে ছ্যাঁৎ করে উঠতেও সময় নেয় না। আমাদের অনুসন্ধান প্রচেষ্টা চলমান আছে। সেই গবেষণার মাঝপথে এই লেখা। 

আমরা জানি, ‘ভয়ের সংস্কৃতি’ {রীয়াজ, আলী; (২০১৪); ভয়ের সংস্কৃতি: বাংলাদেশে আতঙ্ক ও সন্ত্রাসের রাজনৈতিক অর্থনীতি, প্রথমা প্রকাশন, পৃষ্ঠা নং ১১} হলো সমাজে নির্মিত বা তৈরি করা মানসিক অবস্থা। এই অবস্থা ও পরিবেশ যখন প্রবল হয়ে ওঠে এবং সমাজের ভেতরে এর ধারা প্রবাহমান হয়, তখন আমরা বলতে পারি যে ভয়ের সংস্কৃতি  হয়ে উঠেছে ঐ সমাজের প্রধান বৈশিষ্ট্য। কারণ, এক সহিংসতার হাত ধরে সমাজে জন্ম নেয় অপরাপর ভয়ের সংস্কৃতি। আমরা চেষ্টা করছি, ঠিক কোন ধরণের সামাজিক সহিংসতার হাত ধরে বাংলাদেশের ব্রাহ্মণবাড়িয়ার স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি হচ্ছে? এই প্রশ্নটির উত্তর জানার জন্য সরেজমিন অনুসন্ধান করবো আমরা, যা করোনাকালের জন্য সম্ভব হচ্ছে না। তবে ব্রাহ্মণবাড়িয়া নিবাসী শিক্ষার্থীরা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে কিভাবে ‘ট্রোল-ক্যারেক্টারাইজড’ হচ্ছেন তা জানার চেষ্টা করা হয়েছে আমাদের এই কাজে। আমি ব্রাহ্মণবাড়িয়া নিবাসী শিক্ষার্থীদের কাছে কিছু প্রশ্ন করি, এবং তাতে এই উত্তরগুলো পাই-

আমার প্রথম প্রশ্নটি ছিলো ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সংঘর্ষের ঘটনা নিয়ে গণমাধ্যম যেভাবে সংবাদ পরিবেশন করছে তাতে কি আপনি সন্তুষ্ট? হ্যাঁ হলে, কেন? না হলে কেন?’ উত্তরে একজন বলেছেন, ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সংঘর্ষের ঘটনা নিয়ে গণমাধ্যমের পরিবেশন সন্তুষ্টজনক মনে হয় না। আমার মনে হয়, সংবাদের প্রচার বৃদ্ধির জন্য গণমাধ্যম মূল বিষয় থেকে সরে এসে অধিকাংশ সময় হাস্যকর বিষয়ে ফোকাস করে।’ আরেকজন বলেছেন- ‘আমি সন্তুষ্ট না, কারণ ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় অসংখ্য ভাল কাজ হয়, সেগুলোর খবর গণমাধ্যম সেভাবে সম্প্রচার করেনা, যেভাবে তুচ্ছ মারামারি নিয়ে নিউজ হয়৷’ আরো একজন বলেন, ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সংঘর্ষের ঘটনা নিয়ে গণমাধ্যম যেভাবে সংবাদ পরিবেশন করছে এটি আমার কাছে বড় একটি বিরক্তির কারণ। দেখা যায়, তুচ্ছ কোনো ঘটনা যেটি অন্য যেকোনো জেলায় ঘটলে নিউজ হতোনা, কিন্তু ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বেলায় এটি নিউজ হয়ে যায়। যেটি খুবই নিম্নমানের সাম্প্রদায়িক সাংবাদিকতার পরিচয়।’

আামার দ্বিতীয় জিজ্ঞাসা ছিলো- ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নানারকম সংঘর্ষের ঘটনায় ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে নিয়ে অপর জেলার মানুষজন ট্রল করার পেছনে মিডিয়ার ভূমিকা বেশি নাকি সোশ্যাল মিডিয়ার ভূমিকা বেশি? মিডিয়া ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে অতিররঞ্জিত করে তুলে ধরেছে নাকি সোশ্যাল মিডিয়া অতিরঞ্জিত করে তুলে ধরেছে? নাকি মিডিয়ার ক্লিকবেইট শিরোনামের কারণে সোশ্যাল মিডিয়া এভাবে হাইপ তুলতে পারছে?’ উত্তর এসেছে যথাক্রমে এরকম- ‘মিডিয়া, সোশ্যাল মিডিয়া, মিডিয়ার ক্লিকবেইট শিরোনাম প্রতিটি ক্ষেত্রে নিজেদের জনপ্রিয়তার দিকটি মাথায় রেখে হয়ত অতিরঞ্জিত করার চেষ্টা করে যায়’, আরেকজন বলেছে- ‘সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাবটা অবশ্যই বেশি। মূলত সোশ্যাল মিডিয়ায় কিছু ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পরপরই মূল ধারার সংবাদপত্র, নিউজ চ্যানেলগুলো ব্রাহ্মণবাড়িয়ার উপর ফোকাস করা শুরু করে । এরপর আসে চটকদার শিরোনাম, ভেতরে নিউজ কী আছে না আছে সেটা দেখার চেয়ে মানুষ শিরোনামেই আকৃষ্ট হয় বেশি, সাংবাদিকরা এটা খুব ভালভাবে কাজে লাগাচ্ছে৷’ আরেকটি উত্তর আমি পাই যেখানে বলা হয়- ‘যদিও অন্যান্য জেলার মানুষ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সংঘর্ষের ঘটনায় ট্রল করে থাকে সোশ্যাল মিডিয়াতে, কিন্তু আমি মনে করি এর জন্য মেইন স্ট্রিমমিডিয়া সবচেয়ে বেশি দায়ী। কারণ মিডিয়া আগে অতিরঞ্জিত ক্লিকবেইট শিরোনাম করে বলে তুচ্ছ ঘটনাও বড় আকারের সামাজিক সমস্যা হিসেবে সাইবার পরিসরে হাজির হয় এবং ভাইরাল হয়। অন্যান্য জেলার অতি উৎসাহী কিছু মানুষ তখন মুখিয়ে থাকে- কখন ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে নিয়ে কোনো নেতিবাচক নিউজ হবে এবং তারা সেটি শেয়ার, ট্যাগ, মেনশন করতে পারবে। আর ব্রাহ্মণবাড়িয়া নিয়ে পাঠকদের অতি আগ্রহের সুযোগটিকে নিজেদের প্রচারণার কাজে লাগায় মূলধারার মিডিয়া’।

গবেষণায় পরবর্তী প্রশ্ন ছিলো- ‘একজন ব্রাহ্মণবাড়িয়াবাসী হিসেবে নিজের জেলা বা নিজেকে নিয়ে ফেসবুকের কোনো পোস্টে আপনাকে কি কেউ মেনশন করেছে? এতে কি আপনি বিব্রত হয়েছেন? নাকি মজা পেয়েছেন? নাকি বিরক্ত হয়েছেন?’ উত্তর এসেছে- ‘হ্যাঁ, কয়েকবার মেনশন করা হয়েছে। বিব্রত, মজা, বিরক্ত সব অনুভূতিই অনুভব করেছি। এসব অনুভূতি নির্ভর করে সেই সংবাদ এবং ফ্রেন্ডদের কমেন্টের উপর।’ আরেকটি উত্তর আসে- ‘প্রায়ই কেউ না কেউ মেনশন করছে। বন্ধুরা করলে খুব একটা বিব্রত লাগেনা, কিন্তু চিনিনা জানিনা এমন সিনিয়র জুনিয়ররা এসে যখন মজা নেয় তখন বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ি।’ আরেকজনের উত্তর এরকম ‘প্রতিনিয়তই ফেসবুকে ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে নিয়ে বিভিন্ন পোস্টে মেনশন করা হয়। আর বেশিরভাগ পোস্টই থাকে কোনো অনলাইন নিউজপোর্টালের লিংক শেয়ার। এটি আমার কাছে খুবই বিব্রতকর ও বিরক্তিকর। কারণ এরকম সংঘর্ষের অথবা এরচেয়েও ভয়ানক ঘটনা দেশের বিভিন্ন জেলায় অহরহ ঘটে থাকে, অথচ আমরা কখনো সেই জেলার মানুষদের মেনশন দেইনা। এটা তো একটা অপরাধ, এটা সাইবার বুলিং-এর পর্যায়ে পরে। জেলার কোথাও দু-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনার জন্য আমাকে কেন হেনস্তার শিকার হতে হবে।’

অন্য একটি প্রশ্ন ছিলো- ‘আপনি কি মনে করেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার যেসব ঘটনা বার্তাকক্ষের সম্পাদনায় ছাপা হচ্ছে তা যথাযথ? দেশের অন্য কোথাও হামলা-সংঘর্ষ হলে তার সোশ্যাল মিডিয়া ইমপ্যাক্ট এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঘটনার সোশ্যাল মিডিয়ার ইমপ্যাক্ট কি এক? এক না হলে কেন এক নয়?’ উত্তরগুলো ছিলো- ‘আমার মনে হয় বার্তাকক্ষের সম্পাদনায় ঘটনাগুলোর সংবাদমূল্যের ব্যাপারে সচেতনতা বাড়ালে ভালো হয়। সোশ্যাল মিডিয়াতে দেশের অন্য অঞ্চলের হামলা-সংঘর্ষের ঘটনা থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এসব ঘটনা একটু বেশিই আলোচিত, সমালোচিত হয়’। আরেকজনের উত্তর- ‘অবশ্যই যথাযথ না, দেশের কোথাও না কোথাও প্রতিদিনই এপিক কোন ঘটনা ঘটছে, সেগুলো এতটা ফোকাস পায়না যতটা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার চুন থেকে পান খসার নিউজ হলে পায়।’ 

পরবর্তী প্রশ্ন ছিলো ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া রাজনৈতিক ও সামাজিক কারণে সহিংস হয়ে উঠেছে, গণমাধ্যমে প্রচারিত এই সংবাদ ট্রেন্ডকে আপনি কিভাবে দেখেন? যদি হয়ে ওঠে তা কেন হয়েছে বলে ধারণা? এর জন্য বার্তা কক্ষের প্রতি আপনার পরামর্শ কী?’ উত্তর ছিলো- ‘বার্তাকক্ষের প্রতি আমার একটাই পরামর্শ তারা যেন সংবাদকে অতিরঞ্জিত করে তা বিনোদনের পর্যায়ে না নিয়ে যায় এবং তাদের প্রচারনা যেন কোনগোষ্ঠীকে সংঘর্ষের প্রতি উৎসাহিত না করে।’ আরেকজনের উত্তর ছিলো- ‘বাংলাদেশে কোন জেলাকে নিয়ে বিশেষ নিউজ এটাই প্রথম না; বরিশাল, কুমিল্লা, নোয়াখালী নিয়েও আমরা এরকম নিউজ দেখি। সবগুলোই সাংবাদিকতার কারসাজি, কাকে কখন ভাইরাল বানায় এটা তাদের ইচ্ছা৷’ 

আমার পরের প্রশ্নটি ছিলো ‘‘সামাজিক যোগযোগ সাইটে ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে নিয়ে ট্রোল করলে আপনি কী ধরণের আঘাত পান? আপনি কি নিজেকে ‘পর’মনে করেন? এর ফলে কি আপনার নিজের মধ্যে সহিংস প্রতিরোধ বা সোশ্যাল মিডিয়ায় পাল্টা যুক্তি/পাল্টা ট্রল করার প্রবণতা জেগে উঠে? কেন ও কিভাবে?’’ উত্তরে পেয়েছি বেশকিছু চমৎকার বুদ্ধিদীপ্ত ভাবনা। যেমন: ‘পাল্টা যুক্তি দেওয়ার প্রবণতা জেগে উঠেনা, কখনো যুক্তিও দেইনি। হাসি পায় মানুষের বোকামি দেখে, একদল মানুষ তাদের নিউজের ভিউ বাড়িয়ে নিচ্ছে একটা জেলার নাম ব্যাবহার করে। আর আমরা জেনে না জেনে তাদেরকে এই কাজে হেল্প করছি৷’ 

শেষ প্রশ্নটি ছিলো ‘‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া নিবাসী শিক্ষার্থী হিসেবে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে কিভাবে ‘ট্রোল-ক্যারেক্টারাইজড’ হচ্ছেন আপনি?’’ উত্তর আসে এরকম- ‘মাঝে মাঝে হাস্যকর সংবাদের কমেন্ট সেকশনে আমাকে মেনশন করা হয়। সহপাঠিদের কাছে বিভিন্ন নিকনেমও পেয়েছি। কেউ কেউ ইনবক্সে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিভিন্ন নিউজ শেয়ার করে ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ের জন্যও প্রশ্ন করে আমাকে।’ আমার চলমান গবেষণায় আরেকজন তার উত্তরে বলেছেন- ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়াবাসী বলে সকল মারামারি কাটাকাটির পোস্টে সবার আগে মেনশন করে আমাকে। যেকোন মারামারির কথা উঠলে সেখানে কেউ না কেউ একবার ব্রাহ্মণবাড়িয়া শব্দটা লিখে ফেলে। সেটা দেখে কিছুটা আঘাত পাই বটে কিন্তু আশা করি, সোশ্যাল মিডিয়ার এই হাইপ খুব বেশিদিন থাকবেনা। বাংলাদেশ ট্রেন্ডের দেশ, আজ হোক কাল হোক অন্য জেলার উপর ফোকাস চলে যাবে৷’ এই প্রশ্নের আরেকটি উত্তর পাই- ‘বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া শুনলেই বেশিরভাগ মানুষ একটু মুচকি হেসে দেয়। অনেকে হাসে সংঘর্ষের কথা মনে করে আর অনেকে হাসে কিছুটা ভয় পেয়ে। অন্যরা আমাকে একটু ভয় পাবে- এই বিষয়টাকেও আমি মজা হিসেবেই নিই।’   

প্রশ্নোত্তর পর্ব শেষে আমি গবেষণার অংশ হিসেবে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সংঘটিত দশটি ঘটনার মিডিয়া কাভারেজ বিশ্লেষণ করলাম। তাতে দেখা গেলো, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কোনো উপজেলায় সংঘর্ষ হলেই সংবাদের শিরোনামে ‘উপজেলা’র নামের চাইতেও সংবাদমাধ্যমগুলো ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া’ শব্দটিকে রাখার প্রবণতা বেশি। ফলে সেই নিউজের কমেন্ট সেকশনে ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে নিয়ে ট্রল, হাসি ও উপহাসে মেতে উঠছেন পাঠক-দর্শকরা, বাদ নেই দেশের মূলধারার মিডিয়াগুলোও। গুগল সার্চবক্স অনুসন্ধান করে দেখা গেলো- ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীগরের সংঘর্ষের খবরে শিরোনামে ‘নবীনগর’ লিখেছে অপ্রচলিত কিছু গণমাধ্যম। কিন্তু দেশের প্রথমসারির গণমাধ্যমগুলো শিরোনামে ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া’ই লিখছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্রমোদীর সর্বশেষ সফরকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রাম ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সংঘর্ষ হয়। তখন  দুটি মূলধারার গণমাধ্যমের সংবাদ শিরোনাম বিশ্লেষণ করে দেখা গেলো- একটিতে ‘হাটহাজারী’ উল্লেখ থাকলেও, অপরটিতে রয়েছে ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া’! তার মানে হাটহাজারীর সংঘর্ষে ‘চট্টগ্রাম’ জেলার নাম আসছে না। এমনকি আমরা এও খুঁজে পয়েছি চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার সংঘর্ষের খবরের শিরোনামে ‘আনোয়ারা’ শব্দটি উল্লেখ থাকলেও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরের সংঘর্ষের শিরোনামে ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া’ শব্দটি জায়গা করে নিয়েছে। ছোট্ট একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি আরেকটু পরিস্কার হবে। কোপা ফুটবল ফাইনাল খেলাকে কেন্দ্র করে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সংঘর্ষে প্রাণহানির খবরটি দেশ ছাড়িয়ে বিশ্ব মিডিয়াতেও স্থান পেয়েছিলো। কিন্তু এর প্রকৃত সত্যটি আড়াল করা হয়েছে বলে আমাদের ধারণা। সদর উপজেলার খেওয়াই গ্রামে রাতে দুই পক্ষের সংঘর্ষে আহত হয় অন্তত পাঁচজন। শুরুতে বলাবলি হচ্ছিল ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা মধ্যে হয়ে যাওয়া ফুটবল ম্যাচ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে এ সংঘর্ষ হয়। এ নিয়ে দেশের প্রায় সবকটি মূলধারার গণমাধ্যম সংবাদও পরিবেশন করে। আমরা আমাদের গবেষণার অংশ হিসেবে বাংলাদেশের দশটি মিমস পেইজ ও গ্রুপ থেকে দেখেছি, ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে নিয়ে ট্রল করা হয়েছে। অথচ সেই ঘটনায় থানায় করা লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, সংঘর্ষ হয়েছে ‘মাছ ধরাকে কেন্দ্র করে পূর্ববিরোধের জেরে’। ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ এমরানুল ইসলামকে উদ্ধৃত করা হয় একটি সংবাদে। তিনি বলেন, ‘সংঘর্ষের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়। তবে যতটুকু জেনেছি খেলা নিয়ে এ সংঘর্ষ হয় নি। অভিযোগ অনুযায়ী আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে।’ এই খবরটির ফ্যাক্টচেক বা সত্যাসত্য যাচাই করে ‘ফ্যাক্ট চেক’  বিভাগে প্রকাশিত ‘ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা নয়, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সংঘর্ষ মাছ ধরা নিয়ে’ (মাজহারুল করিম অভি, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নিউজ বাংলা টুয়েন্টিফোর ডটকম ১৬ জুলাই, ২০২১ ২২:২০) খবরে এই তথ্যটুকু পাওয়া যায়।

আমরা জানি, সহিংসতা শুধু সহিংসতাই নয়। একটি সহিংসতার লক্ষ্য কেবল প্রতিপক্ষকে দমন করাই নয়, কেবল তাকেই শারীরিকভাবে নিশ্চিহ্ন করা নয়; সহিংসতা ও সন্ত্রাসের লক্ষ্য হচ্ছে আতঙ্ক সৃষ্টি। আর এই আতঙ্কগ্রস্থ জনতা ক্রমান্বয়ে নিজেকে সমাজ থেকে গুটিয়ে নেয়, ভয়ের সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সামাজিক ও ভার্চুয়াল পরিচিতিকে সমাজ-নৃতাত্তিকগতভাবে বিশ্লেষণ করে আমরা দেখতে চাই একটি জনপদের মানুষ নিজেরা কতটা শঙ্কিত এবং সেই জনপদের মানুষ ভিন্ন জেলায় গিয়ে কিভাবে ট্রল-ক্যারেক্টারে পরিণত হচ্ছেন। ফলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সামাজিক সহিংসতার মিডিয়াট্রেন্ড থেকে পরিচিতি পেয়ে ভার্চুয়াল সমাজ হয়ে একচুয়াল সমাজে ভয়ের সংস্কৃতি ও ট্রল-সংস্কৃতির সূচনা করেছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত ‘ক্রাইম নিউজে’ সমাজের মনস্তত্বের খোঁজ-খবর পাওয়া যায়। কোনো সহিংসতার খবর কিভাবে পরিবেশন হচ্ছে, তার ভাষাটি বলে দেয় সেই সমাজের সামাজিক রুচির রূপ। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার একাধিক খবরের কেসস্টাডি অনুসন্ধানের পর আমরা দেখেছি ‘ক্লিকবেইট’ শিরোনামের টার্গেটে পরিণত হয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া। বস্তনিষ্ট, স্বচ্ছ, পক্ষপাতহীনভাবে ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে নিয়ে সংবাদের ভাষা নির্মিত হচ্ছে না। আমাদের বার্তাকক্ষ কতটুকু যোগ্যতার সাথে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার খবর পৌঁছে দিচ্ছে পাঠকের কাছে তা প্রশ্নবিদ্ধ। আমরা আমাদের গবেষণার কাজ সম্পন্ন করার পথে দেখতে পাচ্ছি, এই জনপদকে ক্লিকবেইট সাংবাদিকতার নামে একটি সেনশনালান নিউজ আইটেম হিসেবে মিডিয়া নির্মাণ করে চলেছে। ভবিষ্যতে এই কাজটি আরো বৃহৎ পরিসরে করার চেষ্টা থাকবে আমাদের। আমরা সেসব সংবাদ বিশ্লেষণের পাশাপাশি সংবাদের শিরোনাম বিশ্লেষণ এবং সেসব সংবাদের নিচে পাঠকের মতামত (কমেন্ট) নিয়েও আলোচনা করবো। আমরা খুঁজে দেখার চেষ্টা করবো, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সামাজিক সহিংসতার প্রকৃত কারণ কী এবং কিভাবে তা উপস্থাপিত হয় সেটি। 

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্রাহ্মণবাড়িয়া কেন মিমস ও ট্রল কালচারের প্র্যাকটিস সেটি নিয়ে আরো গভীর অনুসন্ধান দরকার। একটি জেলার জনগোষ্ঠীকে ‘নির্দিষ্ট পরিচয়ে ট্যাগ’ করার প্রবণতা দেশের সামগ্রিক অখণ্ডতার পরিচয়কে প্রশ্নবিদ্ধ করে। দেশের পার্বত্যাঞ্চলের আদিবাসীদের ‘চাম্মো’, উত্তরবঙ্গবাসীদের ‘ভইঙ্গা’ বরিশাল, নোয়াখালী, কুমিল্লা চট্টগ্রামের লোকজনকে ভিন্নভাবে চিহ্নিত করে (বিএনসিসি) কিংবা নেতিবাচক শব্দে ডেকে আমরা যে ‘আত্মতৃপ্তি’ লাভ করি। ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে নিয়ে আমাদের মননজগত সেই পথেই হাঁটছে। এই প্রবণতা জাতিগত পরিচয় নির্মাণের পথে আত্মঘাতি ও ভাতৃঘাতি। আমাদের বদনাম করতে আর ভিনদেশি শত্রু লাগছে না, আমরা নিজেরাই নিজের নাক কেটে অপরের যাত্রা ভঙ্গ করছি। মহাভারতের কৌরবভাইয়েরা যেমন পাণ্ডবভাইদের জতুগৃহে পুড়িয়ে মারার চেষ্টা করেছে, আমরাও তেমনি আঞ্চলিকতার রাজনৈতিক/সামাজিক গরিমায় ‘অপর’কে তাচ্ছিল্য করতে ছাড়ছি না। বাঙালি রসিক জাতি, হাস্যরস তার নিত্যদিনের চর্চার অনুষঙ্গ। কিন্তু নিজ দেশের একটি জনপদকে বিপন্ন, সহিংস এবং মারকুটে হিসেবে ‘ট্যাগ’ লাগানোর প্রচেষ্টা নিছক হাসাহাসির থাকছে না। গণমাধ্যম অধ্যয়ন, সাংস্কৃতিক অধ্যয়ন, রাজনীতি বিজ্ঞান অধ্যয়ন, রাজনৈতিক সহিংসতা বিশ্লেষণ ও সংবাদের রাজনৈতিক অর্থনীতি যারা বোঝেন, তারা অন্তত ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে নিয়ে পাল্টা বয়ান হাজির করবে, এই আমার প্রত্যাশা।

এই পর্যায়ে একটি উদাহারণ দিয়ে লেখাটির সমাপ্তি টানছি। ব্রাহ্মণবাড়িয়া নিবাসী আমার এক শিক্ষার্থী আমার চলমান গবেষণায় সাক্ষাতকারে মত দিয়েছেন এভাবে- ‘‘অদ্বৈত মল্লবর্মণের উপন্যাস (১৯৫৬ সালে প্রকাশিত) অবলম্বনে রচিত ঋত্বিক ঘটকের পরিচালিত ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ সিনেমাটি দেখুন। সেখানেও দেখতে পাবেন নদীর চরদখল নিয়ে কীভাবে নদীর দুই পারের মানুষ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। এই এলাকার ঝগড়ার সংস্কৃতি অনেক বড় আকার ধারণ করার একটা অন্যতম কারণ হচ্ছে এখানকার মানুষদের মধ্যে একতা অনেক দৃঢ়। একজনের কিছু হলে তার জন্য পুরো গ্রাম ছুটে যায়। একতাবদ্ধ হয়ে যে এরা শুধু ঝগড়া করতে যায় এমনটি নয়, অনেক ভালো কাজও করে থাকে। কিন্তু ভালো কাজগুলো নিয়ে মিডিয়াতে কোনো নিউজ হয়না’’। আমার শিক্ষার্থীর এমন বুদ্ধিদীপ্ত উত্তরে আমি চমকে যাই। আমি গবেষণা থেকে চোখ ফেরাই সাংবাদিকতার সংজ্ঞার দিকে। যেখানে বলা হচ্ছে- ‘ব্যাড নিউজ ইজ গুড নিউজ!’

পুনশ্চঃ শুক্রবার সকালে চোখে পড়লো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকের পোস্ট। তিনি লিখেছেন, 'পরীমনির বাড়ি যদি ব্রাহ্মণবাড়িয়া হইত, তাহলে সাংবাদিকরা আরও মজা পাইত।' বিশ্লেষণের অপেক্ষা রাখেনা। একজন শিক্ষকের, ওই অঞ্চলে যার পিতৃভূত তার এমন একটি শ্লেষাত্মক উক্তি এই গবেষণাকাজের যথার্থতাকেই তুলে ধরে।



লেখক: রাজীব নন্দী। সহকারী অধ্যাপক, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; ইমেইল: [email protected] । এই নিবন্ধটি একটি চলমান গবেষণা কর্মের অংশ। গবেষণাকর্মের তথ্যসংগ্রহকারী চবি যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সম্মান দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী শামীম খান ও আফরোজা আক্তার- এর নিকট লেখক কৃতজ্ঞ।

Kabir Steel Re-Rolling Mills (KSRM)
Rocket New Cash Out
Rocket New Cash Out
bKash
Community Bank