মঙ্গলবার   ০৪ অক্টোবর ২০২২ || ১৯ আশ্বিন ১৪২৯ || ০৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

অপরাজেয় বাংলা :: Aparajeo Bangla

ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক অসহিষ্ণুতা

মোহাম্মদ নূরুল হক, প্রাবন্ধিক-সাংবাদিক

১৮:১৬, ২ নভেম্বর ২০২০

আপডেট: ২৩:২৮, ২ নভেম্বর ২০২০

৩১৮০

ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক অসহিষ্ণুতা

পৃথিবীর অন‌্য কোনো দেশের কথা জানি না। কিন্তু বাংলাদেশে ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলোর মধ‌্যে সম্প্রীতির চেয়ে অসহিষ্ণুতা বেশি। আরও বেশি পরস্পরের প্রতি বিদ্বেষ-ঘৃণা-ক্রোধ। প্রত‌্যেক সম্প্রদায়ের লোকই নিজের ধর্মকে সেরা দাবি করেন। আর হীন-নীচ-তুচ্ছ মনে করেন অন‌্য ধর্মাবলম্বীদের। ফলে পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, সমীহ ও সহিষ্ণুতা কমে আসে। 
দেশের বেশিরভাগ মানুষের মধ‌্যে ধর্মীয় অনুভূতি যত বেশি, তত বেশি জ্ঞানচর্চা ও বিদ‌্যার্জনের স্পৃহা নেই। কেবল জ্ঞানচর্চায় তাদের অনীহ-আলস‌্য তা নয়, যে ধর্মের প্রতি তাদের এত অনুরাগ, সেই বিষয়েরও তাত্ত্বিক-প্রায়োগিক বিষয়ে চর্চা নেই তাদের মধ্যে। এমনকী সাধনাও নয়।  এই সাধনা-চর্চার অভাবে তারা কেবল ভিন্ন মতের কারণেই একজন বিশ্বাসীকেও কাফের বলতে কুণ্ঠিত হয় না। কারণ, তারা জানে না, ঈশ্বরবাদী প্রতিটি ধর্মের মূল বাণী একই। তারা প্রত‌্যেকেই স্রষ্টার অস্তিত্বে বিশ্বাস করে। প্রত‌্যেকেই মনে করে, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডসহ মানবজাতিকে সৃষ্টি করেছেন একজন স্রষ্টা। কেবল তাদের কতিপয় শব্দের প্রকাশ-ব‌্যবহারে ভিন্নতা রয়েছে।  যেমন, মুসলমানদের কাছে যা আল্লাহ,তা-ই খ্রিষ্টানদের কাছে গড, হিন্দুদের কাছে ভগবান, বৌদ্ধদের কাছে ঈশ্বর। মূলে কোনো সমস‌্যা বা বিরোধ নেই। বিরোধ এর ব‌্যাখ‌্যায়-বিশ্লেষণে। গ্রহণে-বর্জনে। দ্বন্দ্ব তাদের রুচি-মর্জি-মেজাজ-শিক্ষা-জ্ঞান-প্রজ্ঞায়।
 
ধর্মীয় বিষয়কে কেন্দ্র করে সাম্প্রদায়িক অসহিষ্ণুতা ও দাঙ্গার পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে। তবে, উল্লেখযোগ‌্য কারণ পাঁচটি। এগুলো হলো:

  • ১। ধর্মকে ব‌্যক্তিগত আচরণীয় বিষয় থেকে প্রাতিষ্ঠানিক-রাষ্ট্রীয় পালনীয় বিষয়ে পরিণত করার চেষ্টা।
  • ২। নিজের ধর্মকে ঠিক ও অন‌্য ধর্মকে  ভ্রান্ত মনে করা। 
  • ৩। মানব পরিচয়ের চেয়ে ধর্মীয় পরিচয়কে বড় করে দেখা।
  • ৪। অন‌্যান‌্য ধর্মাবলম্বীর চেয়ে কতিপয় মুসলমান নামধারীর প্রতিক্রিয়া প্রকাশের প্রবণতা বেশি।
  • ৫।   গুজবে মেতে ওঠা।

একথা অনস্বীকার্য যে, ধর্ম মূলত ব‌্যক্তিগত আচরণীয় বিষয়।  এর প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার চেষ্টা মানবজাতির জন‌্য সাংঘর্ষিক হয়ে উঠতে পারে। একটি রাষ্ট্রে  প্রচলিত সব ধর্ম ও মতের মানুষের বসবাস থাকতে পারে।  প্রত‌্যেক ধর্মীয় সম্প্রদায়ের লোক তার নিজ নিজ ধর্ম স্বাধীনভাবে পালন করবে।  অন‌্য ধর্মের লোক সেখানে বাধা হয়ে দাঁড়াবে না।  এমনকী রাষ্ট্র বা প্রতিষ্ঠানও কোনো ব‌্যক্তিকে ধর্মীয় আচরণ পালন সম্পর্কে বাধ‌্য করবে না কিংবা নিরুৎসাহিতও করবে না।  অর্থাৎ ধর্ম হবে একান্ত ব‌্যক্তিগত অভ‌্যাস-বিশ্বাস-কর্মের বিষয়। ধর্মীয় আচার-বিধিকে ভয়-ভীতিকর করে তোলা অশোভন-অন‌্যায‌্য-অন‌্যায়। মানবতার বিপক্ষেও।  ফলে ধর্মপালনকে করে তুলতে হবে সাংস্কৃতিক-আনন্দপূর্ণ ও উপভোগ‌্য।  মনে রাখতে হবে, যে ধার্মিকদের মধ‌্যে ধর্মকে ভীতিকর করে তোলার পরিবর্তে উপভোগ‌্য করে তোলার প্রবণতা বেশি, সেই ধার্মিকরা সমাজ-রাষ্ট্র ও স্বসম্প্রদায়ের কাছে তত বেশি সম্মানের, শ্রদ্ধার ও সমীহের।  আর যারা ধর্মকে হাতিয়ার করে মানুষের মধ‌্যে ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করেন, তারা সমাজে-রাষ্ট্রে তো অশ্রদ্ধার হনই, পরন্তু স্বসম্প্রদায়ের লোকও তাদের দেখে সন্দেহের চোখে।  তাদের কাছে সবসময় ধর্মের জন‌্য মানুষ, মানুষের জন‌্য ধর্ম নয়। তাই তারা ধর্মের নামে নিজের মতাদর্শ চরিতার্থ করতে গিয়ে অন‌্যকে অসম্মান তো করেনই, সঙ্গে ভিন্ন মতাবলম্বীকে হত‌্যা করতেও লোকজনকে প্ররোচিত করেন।

ভিন্ন মতালম্বীকে প্রতিহত করার মানসিকতা কেন তাদের মধ‌্যে জেগে ওঠে—এমন প্রশ্নের জবাব খুঁজতে গেলে তাদের ধর্মীয় শিক্ষা, পারিবারিক-সামাজিক পরিবেশ প্রভাব বিচার করতে হবে।  উল্লিখিত বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করলেই স্পষ্ট হবে—এই শ্রেণীর মানুষের সংখ‌্যা খুব বেশি নয়।  তারা প্রকৃত অর্থে ধার্মিকও নন। ধর্মের মৌলিক বিষয়, সংজ্ঞা, অর্থ ও ব‌্যাখ‌্যা পরিপূর্ণভাবে তারা জানেন না।  লোক-পরম্পরা শুনে শুনে ধর্ম ও ধর্মীয় আচরণবিধি সম্পর্কে তারা এক ধরনের ধারণা পান। সেই সব ধারণা কোনো রকম যাচাই-বাছাই না করেই তারা বিশ্বাস করেন।  আর  এই বিশ্বাসই তাদের প্ররোচিত করে নিজের ‘ধর্ম’কে ঠিক ও শ্রেষ্ঠ বলে দাবি করতে। একইসঙ্গে অন‌্য ধর্মকে ভ্রান্ত বলে ভাবতে তাদের বাধ‌্য করে। 

এই শ্রেণীর মানুষ নিজের ধর্মীয় পরিচয়কে সবচেয়ে বড় করে দেখে। তারা মানবজাতির মনুষ‌্যত্বকে সম্মান করতে চান না, কিন্তু ধর্মীয় পরিচয়কে দেন সর্বাধিক গুরুত্ব ও মর্যাদা।  চণ্ডীদাসের অমীয় বাণী ‘সবার উপরে মানুষ সত‌্য, তাহার ওপরে নাই’ এই শ্রেণীর মানুষের কাছে কোনো গুরুত্ব বহন করে না।   ধর্ম-বর্ণ-গোষ্ঠী-সম্প্রদায়-জাতিভেদের চেয়ে মানুষকে বড় করতে দেখতে না পারার কারণে, তারা এক ধরনের বদ্ধমূল ধারণার বৃত্তে ঘুরপাক খান। সেই বৃত্ত তাদের বাইরের দুনিয়ার আলো-হাওয়ায় আসতে দেয় না।   কখনো মনের ডাকে বের হতে চাইলেও ভেতরের অপধার্মিক সত্তা তাদের সেই মুক্তির পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।  ভেতর থেকে তাদের মন কু-ডাক শোনে—‘ধর্মের চেয়ে বড় কিছু নেই। কোনো কিছুতেই মুক্তি নেই।  অতএব  তুমি যা করছিলে এতকাল, তাই করে যাও।  জ্ঞানের মুক্তির পথকে রুদ্ধ করে দাও।’ এই ডাক এতটাই বিমোহিত করে দেয়, তাদের আলোর পথের সন্ধান দেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।  

এরফলে তার স্ব-স্ব ধর্মমতের বাইরে থাকা লোকদের আর সহ‌্য করতে পারে না।  ভিন্ন মতাবলম্বী মাত্রই তাদের কাছে বিপথগামী। সুতরাং হয় তাদের বুঝিয়ে কিংবা বলপ্রয়োগ করে গোত্রভুক্ত করতে হবে, না হয় তাদের প্রতিহত কিংবা নিধন করতে হবে।  এক্ষেত্রে প্রথম চেষ্টায় সফল না হলে দ্বিতীয় পথ বেছে নেয় অধিকাংশ ধার্মিক নামধারী।  কোনো কারণ ছাড়াই তারা ভিন্ন ধর্ম ও ভিন্ন মতাবলম্বীদের হত‌্যা করতেও কুণ্ঠিত হয় না। এই শ্রেণীর ধার্মিক মুখোশধারীদের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট‌্য হলো—তারা নিজ-নিজ ধর্মের মহিমাকীর্তন যতটা না করেন, তারাও বেশি নিন্দা করেন অন‌্য ধর্মের।  নিজ-নিজ ধর্মের মহিমাকীর্তন করার সময় অন‌্য ধর্মের লোকেরা মর্মাহত হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে তারা গ্রাহ‌্যই করেন না।  

মানুষের ধর্মানুভূতিতে সবচেয়ে বেশি আঘাত দিয়ে কথা বলেন কতিপয় মুসলমান বক্তা। বিভিন্ন ওয়াজের অনুষ্ঠানে তারা ইসলামও একেশ্বরবাদের মহিমা বর্ণনা করতে গিয়ে প্রতিমাপূজারিদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তাদের তাচ্ছিল‌্য করে উপস্থাপন করেন। এমনকী একদা কাবাঘরে থাকা ৩৬০টি মূর্তি ভাঙার কাহিনিও তারা বেশ গর্বের সঙ্গে বর্ণনা করেন। এই বর্ণনার সময় তারা একবারও ভেবে দেখেন না, যে কর্মের জন‌্য তারা নিজেদের বীরত্ব প্রকাশ করছেন, সেই কর্মই প্রতিমাপূজারিদের অনুভূতিতে গভীরভাবে আঘাত করছে।  কিন্তু যাদের মনে আঘাত দেওয়া হচ্ছে, তারা সংখ‌্যালঘু বলে এসব বক্তব‌্যের প্রতিবাদ করার সাহস পাচ্ছে না। অথবা তারা মুসলমানদের চেয়ে বেশি সহিষ্ণু বলে প্রতিবাদ করছে না।

ভিন্ন ধর্ম ও ভিন্ন মতাবলম্বীদের কটাক্ষকারীদের মধ‌্যে ভারতীয় বক্তা জাকির নায়েকসহ এমন অনেকের সন্ধান পাওয়া যাবে, যারা মানুষকে মানবতার পথের দাওয়াত দেন না। মানুষকে মঙ্গলচিন্তায় উদ্বুদ্ধ করেন না। নিজে যা জানেন, তাকেই ধ্রুবজ্ঞান দাবি করে স্রষ্টার কিংবা স্ব-স্ব ধর্মীয় অবতারের নামে চালিয়ে দেন। দর্শন-ধর্মতত্ত্ব কিংবা শিল্প-নন্দনতত্ত্বচর্চা নিয়ে কোনো কথা বলেন না। উল্টো জিজ্ঞাসাতাড়িত মানুষকে সামাজিকভাবে বয়কটের হুমকি ও পারলৌকিক শাস্তির ভয় দেখিয়ে থামিয়ে দেন।   

আর সাধারণ মানুষ এসব হুমকি কিংবা শাস্তির ভয়ে না থামলে কতিপয় ধর্মীয় লেবাসধারী গুজব প্রচারে মেতে ওঠে।  তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ধর্মানুভূতিকে কাজে লাগিয়ে সমাজে গুজব রটিয়ে দেয় তারা।  সেই গুজবের বলি হতে হয় কখনো ধর্মীয় সংখ‌্যালঘু সম্প্রদায়ের কোনো নিরীহ ব‌্যক্তিকে, কখনো তাদের উপাসনালয়কে।  আবার নিছক ভিন্ন মতপোষণ করায় কিংবা ব‌্যক্তিগত স্বার্থের কারণে স্বধর্মের নিরীহ লোককেও এই স্বার্থান্ধ-ধর্মান্ধরা হত‌্যা করতেও ছাড়ে না।  

উল্লিখিত মতে পক্ষে প্রমাণ চাইলে হাজির করা কঠিন হবে না। কয়েকটি ঘটনা এখানে তুলে ধরা হলো—২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর ‘কোরআন অবমাননা করে ফেসবুকে ছবি পোস্ট’ করার অভিযোগ তুলে কক্সবাজারে রামুর ১২টি বৌদ্ধমন্দিরে আগুন দেওয়া হয়৷ এ সময় হামলা করা হয় বৌদ্ধদের বাড়িঘরেও।
 
২০১৬ সালের ২৯ অক্টোবর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে ‘রসরাজ দাস নামে এক যুবক ফেসবুকে ধর্ম অবমাননাকর ছবি পোস্ট করেছে’—এমন অভিযোগ তুলে তাকে পিটিয়ে পুলিশে দেয় একদল যুবক।  পরদিন এলাকায় মাইকিং করে নাসিরনগর উপজেলা সদরে আলাদা দুটি প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশে অংশগ্রহণকারীরা নাসিরনগরে হিন্দুদের মন্দির ও বাড়িঘরে হামলা চালায়। 

এত গেলো অন‌্য ধর্মের লোকের সঙ্গে ধর্মান্ধ-গোঁড়াদের আচরণের বিবরণ।  তারা মতের অমিল হলে স্বধর্মের আস্তিককেও যে ছাড়ে না, তারও নজির রয়েছে। ‘মুসলমান পরিচয়ধারী’ উন্মত্ত  জনতা গত ২৯ অক্টোবর লালমনিরহাটে শহিদুন্নবী জুয়েল নামের একজনকে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার অভিযোগে পিটিয়ে হত্যা করে।  কেবল হত‌্যা করেই থেমে থাকেনি তারা, জুয়েলের লাশ তারা আগুনেও পুড়িয়ে দেয়।

উল্লিখিত তিনটি ঘটনাই গুজব ছড়িয়ে ঘটানো হয়েছে। অর্থাৎ কতিপয় বেশধারী বাঙালি মুসলমান ন‌্যায়-নীতি-আদর্শ-ধর্মীয় মূল‌্যবোধের কোনো তোয়াক্কাই করে না। তারা নিজেদের মর্জিমতো গুজব ছড়িয়ে দেয়। আরেক দল অন্ধ অনুসারী সেই গুজবের হুজুগে মেতে ওঠে। তাদের এই উন্মত্ততার কবলে পড়ে প্রাণ যায় সবসময়ই নিরীহ-অসহায়দের।  
 
এই ধর্মান্ধ উন্মত্ত জনতা-ধর্মীয় বেশধারীদের হাত থেকে মানবতা-দেশ-জাতিকে রক্ষা করতে হলে সরকারকে এখনই সচেতনতামূলক কর্মসূচি হাতে নিতে হবে।  প্রাথমিক থেকেই মানবতার প্রতি, ভিন্ন ধর্ম-মতাবলম্বীদের প্রতি শিশুমনকে সহিষ্ণু করে তুলতে হবে।  পরিবার ও সমাজেও এই চর্চা অব‌্যাহত রাখতে হবে।  একইসঙ্গে ধর্ম যে ব‌্যক্তিগত আচরণীয় বিষয়, রাষ্ট্রীয় বা প্রাতিষ্ঠানিক চর্চার অনুষঙ্গ নয়, সেই  শিক্ষা শৈশব থেকেই দিতে হবে। আর এজন‌্য উদ‌্যোগ নিতে হবে এখনই। না হলে অদূর ভবিষ‌্যতে কেবল ধর্মীয় ইস‌্যুকে কেন্দ্র করে বেঘোরে প্রাণ হারাতে হবে শত শত নিরীহ-অসহায়কে। 

লেখক: কবি-প্রাবন্ধিক-সাংবাদিক

Kabir Steel Re-Rolling Mills (KSRM)
Rocket New Cash Out
Rocket New Cash Out
BKash Payment