?>

মঙ্গলবার   ১১ মে ২০২১ || বৈশাখ ২৮ ১৪২৮ || ২৮ রমজান ১৪৪২

অপরাজেয় বাংলা :: Aparajeo Bangla

বৈশাখের অনিঃশেষ মুক্তিচেতনা

শারফিন শাহ, গবেষক ও প্রাবন্ধিক

১৩:৩৬, ১৪ এপ্রিল ২০২১

আপডেট: ১৪:৩০, ১৪ এপ্রিল ২০২১

২৬৪

বৈশাখের অনিঃশেষ মুক্তিচেতনা

বাংলার ঋতুচক্রে বৈশাখ মাস কোন মঙ্গলবার্তা নিয়ে আসেনা। খরতাপদগ্ধ আবহাওয়া, ঝড়ের নারকীয়তা, প্রাণঘাতী অশনিপাত, ফসলনাশী শীলাবৃষ্টি প্রভৃতি কারণে এ মাস কৃষিজীবী মানুষের কাছে আকালের ইঙ্গিতবাহী। তাই নাগরিক জীবনে যেভাবে বৈশাখ আসে রবীন্দ্রনাথের গানের তালে, প্রান্তিক জীবনে সেভাবে আসেনা। 

তবু বৈশাখের আবেদন অনস্বীকার্য। বৈশাখ কখন কীভাবে এল, কে কীভাবে উদযাপন করছে, কে করছে না এসব বিতর্কের চেয়ে বড় হচ্ছে এর সার্বজনীন তাৎপর্য। একটি জাতিকে একই সূত্রে গেঁথে ফেলা, একই বৃত্তে টেনে আনা, একই মিলনরসে সিক্ত করার মতো এমন উৎসব বিশ্বে বিরল। ধর্ম, বর্ণ, গোত্র নির্বিশেষে এ আনন্দযজ্ঞ সবার। মুসলমান সমাজের কোথাও 'হিন্দুয়ানী' উৎসব হিসেবে বৈশাখ উদযাপনের যে ধারণা রয়েছে তা পুরোপুরি ভ্রান্ত। হিন্দু ধর্মগুরুরাই এ বিষয়ে নিশ্চয়তা দিয়েছেন যে, তাদের শাস্ত্রীয় আচারে বৈশাখী পূজার কোন অস্তিত্ব নেই। শুধু হিন্দু কেন, মুসলিম, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ ধর্মেও বৈশাখ স্বীকৃত নয়। এ প্রয়াস বাঙালির শেকড় থেকে উত্থিত। তাই এতে সাম্প্রদায়িকতার গন্ধ খোঁজা অবান্তর।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমেই বাঙালি মুসলমানের সাংস্কৃতিক ভিত্তি চিরায়ত রূপ পায়। পাকিস্তানের ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদের বদলে ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনায় জাগ্রত হয় সচেতন মহল। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন সেই চেতনার কেন্দ্রবিন্দুতে। ফলে পাকিস্তানী শাসকদের কাছে রবীন্দ্রনাথ হয়ে ওঠেন চক্ষুশূল। ক্রমান্বয়ে রবীন্দ্রসংগীত নিষিদ্ধকরণ, রবীন্দ্রজন্মশতবর্ষ উদযাপনে বাধা প্রদান করে যে সাংস্কৃতিক সন্ত্রাস সৃষ্টির ছক কষছিল স্বৈরাচারী পাক সরকার, বৈশাখ তা রুখে দিয়েছিল বীরদর্পে। ১৯৬১ সালের ২৫শে বৈশাখ সকল বিধি-নিষেধের শেকল ছিঁড়ে রবীন্দ্রজন্মশতবার্ষিকী অনুষ্ঠিত হওয়ার পর ১৯৬৩ সালে রমনার বটমূলে প্রথমবার রবীন্দ্রনাথের আবাহনী গানে স্বাগত জানানো হয় পহেলা বৈশাখকে। এরপর যখনই বকধার্মিকদের আক্রমণে পর্যুদস্ত হয়েছে বাঙালি সংস্কৃতি, তখনই বৈশাখের মুক্তিচেতনা এসে দাঁড়িয়েছে মঙ্গলদূত হিসেবে। এমনকি বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও আশির দশকের স্বৈরাচারী ভিতকেও নাড়িয়ে দিয়েছিল বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রা। মুক্তিকামী মানুষকে যে জিয়নকাঠির স্পর্শ দিয়েছিল বৈশাখ তা কালান্তরে চিন্ময়ী রূপ পরিগ্রহ করেছে। আজও যেসব কূপমন্ডূক পাকিস্তানী ভাবাদর্শের মোহন মায়ায় আবদ্ধ, তাদের সেই বলয় ভেঙে দিতেই ফিরে আসে বৈশাখ; ফিরে আসে রবীন্দ্রনাথ। 

এটা সত্য যে, বৈশাখের পুরোনা চেহারা এখন আর নেই। পুঁজিবাদীরা এই এই মিলনোৎসবের খোলনলচে পাল্টে দিয়েছে। বড় বড় কর্পোরেট কোম্পানি কাড়ি কাড়ি অর্থ ঢেলে একরকম কিনে নিয়েছে এর সবটুকু রঙ। তবু একটি পরিবারের সদস্যরা যখন বৈশাখের ভোরে ওঠে পান্তা খায়, চৌদ্দ রকমের সবজির স্বাদ নিয়ে শারীরিক সুস্থতার আশা পোষণ করে, মেয়েরা নকশাকাটা শাড়িতে অপরূপা সাজে, ছেলেরা মাথায় গামছা বেঁধে পাজামা-পাঞ্জাবিতে ফুটে ওঠে, আউল-বাউলের সুর ধ্বনিত হয় পথে প্রান্তরে, মৃৎশিল্প ও কারুশিল্পের নানারকম সামগ্রী নিয়ে বসে মেলা—তখন একজন ভিনদেশির অস্তিত্বকেও চমকে দিয়ে যায় বৈশাখের ছন্দ-সুষমা। আর আত্মভোলা বাঙালিও অনুভব করে তার মৌলিক চেতনাকে। যে চেতনার অপর নাম সকল জরাজীর্ণতা থেকে মুক্তি।

বস্তত, বৈশাখের এই সেতুবন্ধ হয়তো নানা অভিঘাতে রূপান্তরিত হবে, তৃতীয় প্রজন্ম, চতুর্থ প্রজন্ম, পঞ্চম প্রজন্মের মতো প্রযুক্তির দাপটে নাকাল হবে, উন্নয়নের রাহুগ্রাসে বিবর্ণ হবে—কিন্তু যখন ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রামের রূপালি পর্দায় ভেসে ওঠবে বৈশাখী সাজ ও ভোজের কোন একটি ছবি—তখন একজন খাঁটি বাঙালি কী পারবে সেই ছবির মর্ম অস্বীকার করতে? 

DBBL Nexas Card
TELETALK