অপরাজেয় বাংলা :: Aparajeo Bangla

বদলায় না কিছু, বদলাতে হয়

কবির য়াহমদ, সাংবাদিক ও লেখক

প্রকাশিত: ০৯:৫৩ এএম, ৪ জানুয়ারি ২০২১ সোমবার   আপডেট: ০৫:৫৩ পিএম, ৪ জানুয়ারি ২০২১ সোমবার

২০২০ শেষ, ২০২১ শুরু। হতাশার কাল শেষে আশাবাদের গানের শুরু হয়েছে, আশাবাদী সাহিত্য আওড়ানো হয়েছে। ব্যক্তিজীবনে, সামাজিক জীবনে, জাতীয় জীবনের সবখানে। আশাবাদের ব্যাপ্তি এত বিস্তৃত যে দেশে-দেশে, সমাজে-সমাজে মানুষ একইভাবে একই গান গেয়েছে। ভয়াল মূর্ত-বিমূর্ত বন্দিত্বের অবসানে একটা নতুন ভোরের আশায় থেকেছে মানুষ। পৃথিবীর অসুখ এবার সারবে; এমন কথা, এমন আকাঙ্ক্ষার বার্তা ভেসেছে নানা জায়গায়। সুখবরের প্রত্যাশায়, সুদিনের আশায় মানুষ দিন গুনে বলে বেঁচে থাকাটা মধুর। বেঁচে থাকতে চায় মানুষ।

মানুষের মধ্যকার এই আকাঙ্ক্ষা পৃথিবীর সমান বয়েসি। আশা থাকে বলে মানুষ বাঁচে, আশা থাকে বলে মানুষ এগোয়, এগুতে চেষ্টা করে। ভালোভাবে বেঁচে থাকা আশা না থাকলে মানুষের জীবনটাই হয়ে পড়ত স্থবির কোনো পাথরখণ্ড। ২০২০ সাল কালের অতলে হারিয়ে গেছে। বছরের পুরোটা সময় আমাদের দেশে-সারাবিশ্বে যে ক্ষত রেখে গেছে তাকে সঙ্গে নিয়ে আমরা পা রেখেছি ইংরেজি বছরের ক্যালেন্ডার তথা গ্রেগরিয়ান বর্ষপঞ্জির পরের বছরে, ২০২১-এ। এই ক্ষত সারাতে আমাদের নতুন বছরের দিকে অদৃষ্টবাদী হয়ে তাকিয়ে থাকলেই চলবে না, নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করতে হবে। এর শুরু ব্যক্তি পর্যায় থেকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়, এর ব্যাপ্তি আন্তর্জাতিক পরিসরেও।

করোনাভাইরাসের ভয়াল থাবায় প্রকম্পিত সারা বিশ্ব। এই ভাইরাসে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক মহামারি হিসেবে ঘোষণা করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। পৃথিবীর প্রতি দেশই প্রাণঘাতী এই ভাইরাসে আক্রান্ত। মারা গেছে লাখ লাখ লোক, আক্রান্ত হয়েছে কোটি কোটি লোক। এই মৃত্যু, এই আক্রান্তের ব্যাপারটা অতীত হয়ে গেলে বোধহয় স্বস্তি পেত বিশ্ববাসী, আমরাও। কিন্তু সেটা হয়নি। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে চিনের উহানে যে ভাইরাস শনাক্ত হয়েছিল গত বছরের পুরোটা সময়ে দাপিয়ে বেড়িয়েছে পৃথিবীর প্রতি দেশে। একবছরের বেশি সময়ে এই মহামারিতে উন্নত দেশগুলো যেমন ভয়াবহ ক্ষতি মুখে পড়েছে, তেমনি উন্নয়নশীলসহ অনুন্নত দেশগুলোও। এই রোগের ভয়াল রূপ আবার দেখেছে গেল বছরের শেষদিনে। ওয়ার্ল্ডোমিটারের তথ্য অনুযায়ী, বছরের শেষ দিন বিশ্বব্যাপী রেকর্ড ৭ লাখ ৩৬ হাজার ৬৮০ জনের দেহে করোনাভাইরাসের অস্তিত্ব শনাক্ত হয়। এই সংখ্যাসহ ৩১ ডিসেম্বর ২০২০ পর্যন্ত সারাবিশ্বে এই শনাক্ত রোগীর সংখ্যা গিয়ে পৌঁছায় ৮ কোটি ৩৮ লাখ ২৪১ জনে। মারা যান ১৮ লাখ ২৫ হাজার ৩০ জন। এই দুই সংখ্যার বাইরে একমাত্র ইতিবাচক ব্যাপার হলো গেল বছরের শেষ দিন পর্যন্ত ভয়াবহ করোনা জয় করে ফিরেছেন ৫ কোটি ৯৩ লাখ ২৮ হাজার ৪৩৩ জন।

বাংলাদেশে গত বছরের ৮ মার্চ প্রথম করোনা আক্রান্ত রোগীর তথ্য জানানোর পর ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে মোট ৫ লাখ ১৩ হাজার ৫১০ জন রোগী শনাক্ত হন। এই সময়ে দেশে মারা গেছেন ৭ হাজার ৫৫৯ জন, এবং করোনা থেকে সুস্থ হয়েছে ওঠেছেন ৪ লাখ ৫৭ হাজার ৪৫৯ জন। এটা সরকারি হিসাব। এরবাইরে আরও অনেক আছে, ছিল। অনেকেই উপসর্গ থাকার পরেও নমুনা পরীক্ষা করাননি, অনেকেই করোনার উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন। সরকারি যে তথ্য সেটা বাংলাদেশে করোনার অফিসিয়াল হিসাব। এরবাইরে যা আছে সেগুলো দাপ্তরিক হিসাব না হলেও অসত্য নয়।

বিশ্বে করোনাভাইরাসের প্রথম রোগী ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে শনাক্ত হলেও মার্চের ১১ তারিখে কোভিড-১৯ রোগ সৃষ্ট পরিস্থিতিকে বৈশ্বিক মহামারি হিসেবে ঘোষণা দেয় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। এই রোগে টালমাটাল হয়েছে বিশ্ব। টালমাটাল বিশ্বে সামাজিক ব্যবস্থা, অর্থনৈতিক ব্যবস্থাসহ সকল কিছু ভেঙে পড়েছে। নতুন আবিস্কৃত এই রোগকে জয় করতে করোনা প্রতিরোধে টিকা আবিস্কার হয়েছে। ইতোমধ্যেই বিশ্বে অনেক দেশ কয়েকটি কোম্পানির টিকাকে অনুমোদন দিয়েছে। অনেক দেশে এই টিকা প্রয়োগ শুরুও হয়েছে। এই টিকা কতখানি কার্যকর সে সিদ্ধান্ত আসবে আরও পরে। অন্য অনেক দেশের মত বাংলাদেশেও আসবে টিকা। অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা কিনতে সেরাম ইন্সটিটিউট অব ইন্ডিয়া এবং বাংলাদেশের বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের সঙ্গে চুক্তি করেছে সরকার। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী আগামী ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে টিকা আসতে যাচ্ছে। বাংলাদেশে এই টিকার আমদানি অন্য দেশগুলোর মত আমাদেরও যুদ্ধজয়ের চেষ্টা।

টিকা দেশে আসলে হুট করে যে একদিনেই সব বদলে যাবে এমন না। বৈশ্বিক এই মহামারিকে নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারার আগ পর্যন্ত আমাদের নানা বিধিনিষেধ মেনে চলে হবে। সরকার নির্দেশিত স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে। স্বাস্থ্যবিধি না মানার আমাদের সহজাত যে প্রবণতা তা আমাদের নিজেদেরকে, পরিবারকে, নিজেদের পরিবেশকে বিপন্ন করে তুলবে। সরকার স্বাস্থ্যবিধি মানতে প্রশাসনকে কাজে লাগাচ্ছে। এটা সীমিত পরিসরে, অনেকটা ঢিলেডালাভাবে হলেও একে জোরদার করা উচিত। মাস্ক পরিধানের নির্দেশনাকে অগ্রাহ্য করা এবং স্বাস্থ্যবিধি না মানার যে প্রবণতা এটা বন্ধ করতে হবে। পুলিশ কিংবা অন্য কোন প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল কাউকে দেখে স্বাস্থ্যবিধি মানার চেষ্টা, এবং তাদের ফিরে যাওয়ার পর বেপরোয়া চলাফেরা বন্ধ করতে হবে। তা না হলে সমাজের কিছুই বদলাবে না; পরিবার, সমাজ ও দেশের ওপর করোনার ব্যাপক প্রাদুর্ভাবের যে শঙ্কা সেটা দূরীভূত হবে না।

গ্রেগরিয়ান বর্ষপঞ্জির নতুন বছরে আমরা পা রেখেছি বলে ২০২০ সালের জায়গায় লিখছি এখন ২০২১ সাল। নতুন বছরে ক্যালেন্ডারের পাতার মত সবকিছু বদলে যাবে এমনটা ভাবার কারণ নাই। যা কিছু বদলানোর বা বদলানো উচিত সেটা আমাদের স্ব স্ব অবস্থান থেকে করতে হবে। সরকারের কাজ জনস্বাস্থ্য রক্ষায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ, টিকা প্রাপ্তিসাপেক্ষে সেটা দ্রুত আমদানি করে মানুষকে বেঁচে থাকার পথের দিশা দেওয়া। আমাদের কাজ নাগরিক দায়িত্ব পালনে সরকার নির্দেশিত স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা। তা না হলে এই দুঃসহ অবস্থা থেকে আমাদের মুক্তি কঠিন।

প্রতিবার নতুন বছরকে সামনে রেখে আমরা নিজেরা আশার বাণী আওড়াই, আশার বাণী শুনি। এবারও এর ব্যতিক্রম হয়নি। বরং আরও বেশি করে আমরা আশার বাণীগুলো আওড়িয়েছি। আমাদের ব্যাখ্যাতীত ভাবনাগুলো সাহিত্যের নানা ক্ষেত্রে গুণীজনেরা লিখে গেছেন, লিখে যাচ্ছেন বলে আমরা গভীর আগ্রহে ওগুলো সামনে আনি ফের, সামনে এনেছি এবারও। পুরাতন বছরের গ্লানি-হতাশা ভুলে যাওয়ার কথা বলতেও একইভাবে আমরা শিল্প-সাহিত্যের আশ্রয় নিই, নিয়েছি। কিন্তু ওখানেই থেমে থাকলে চলবে না। শৈল্পিক আবেশে আমরা যখন নিজেদের অনাগত আগামীকে কল্পনা করি তখন বাস্তবে এই শিল্পের পরশ বুলাতে দরকার নিজেদের দায়িত্ব পালন। ব্যক্তি-সমষ্টি ও রাষ্ট্রের স্ব স্ব দায়িত্ব পালনেই আসতে পারে মুক্তি। তা না হলে ক্যালেন্ডারের পাতাবদল, দিনবদল, মাসবদল, বর্ষবদল কেবল ক্যালেন্ডারেই থেকে যাবে; আমাদের জীবনে কোন প্রভাব ফেলবে না।