আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপনে প্রিয়বাংলা ও আর্লিংটন আর্টসের অনন্য পরিবেশনায় মুগ্ধ সকলেই
প্রকাশিত: ০৬:৪৮ এএম, ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ বৃহস্পতিবার আপডেট: ০৭:২১ এএম, ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ বৃহস্পতিবার
একটি অনুষ্ঠান যখন আপনি বিমোহিত হয়ে উপভোগ করতে থাকেন, তখন আর মনেই থাকেনা কোন ফাঁকে কখন সময় পেরিয়ে যায়! কিংবা আপনি ভাবতেই পারবেন না এই অনুষ্ঠান থেকে আপনি নিজে আলাদা কিছু। গত রোববার যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়ায় প্রিয়বাংলা ও আর্লিংটন কাউন্টি-আর্লিংটন আর্টসের আয়োজনে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপনের অনুষ্ঠানটি ছিলো ঠিক তেমনই।
আর্লিংটনের কেনমোর মিডল স্কুলে অনুষ্ঠানস্থলে যখন উপস্থিত হই, মূল সেমিনারটি কিছুক্ষণ আগে শুরু হয়ে তখনো চলছে। প্যানেলিস্ট ছিলেন আর্লিংটন কাউন্টি বোর্ড মেম্বার টাকিস পি. কারান্টোনিস, জুলিয়াস ডি. স্পেইন, কলাম্বিয়া পাইক পার্টনারশিপের এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর অ্যান্ড্রু সিনেডার, আর্লিংটন কাউন্টি বোর্ডের ফার্স্ট ল্যাটিনো মেম্বার ড. এমা ভায়োল্যান্ড স্যানজেস, মেরিল্যান্ড ডিপার্টমেন্ট অব হেলথের হেলথ পলিসি অ্যানালিস্ট মুক্তা বেইন, মিসেস ট্যুরিজম ইউএসএ ইউনিভার্স ড. রাজশ্রী শ্রেষ্ঠা, ভেটেরানস অ্যাফেয়ার্স মেডিকেল সেন্টারের ড. সৈয়দ মাহতাব আহমেদ। আলোচনার সঞ্চালনায় ছিলেন ইন্ডিপেন্ডন্ট কনসালট্যান্ট মার্শা এল সেমেল। আর সভাপ্রধানের দায়িত্বে ছিলেন তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, শিক্ষক ড. প্রিয়লাল কর্মকার। প্রিয়বাংলার প্রধান সমন্বয়কও তিনি।

কেনমোর মিডল স্কুলে সেদিন স্থাপিত হয়েছিলো একটি শহীদ মিনার। যার বেদীতে ফুল ছড়ানো। আর সাদা-কালোয় সজ্জিত হয়ে আসা মানুষগুলো সেই শহীদ মিনারেই শ্রদ্ধা নিবেদন করছিলেন ফুল দিয়ে। অনেকেই ছিলেন ছবি তুলতেও ব্যস্ত।
বলা চলে, মাসাধিককাল কিংবা তারও বেশি সময় ধরে একটি সুগঠিত টিমের নিরলস প্রচেষ্টারই এক সফল বাস্তবায়ন ছিলো এই অনুষ্ঠানটি। মূলতঃ মূলধারার আমেরিকাকে সম্পৃক্ত করে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের এমন আয়োজন এটাই প্রথম। যা একটি ভবিষ্যৎ পথ চলার পথও রচনা করলো, এমনটিই বলছিলেন প্রিয়লাল কর্মকার, তথা অন্য বক্তারা।
ভাষার বৈচিত্রের যে সৌন্দর্য, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উৎযাপনে তা তুলে ধরার সুযোগটাই সবচেয়ে বেশি থাকে, মত ছিলো বক্তাদের। অনুষ্ঠানে শোনানো হলো ইউএস সেনেটর মার্ক ওয়ার্নারের পাঠানো বিশেষ ভিডিও বার্তা। যাতে তিনি এমন একটি আয়োজনের গুরুত্ব ও কমিউনিটিতে তার প্রভাবের কথাই জোর দিয়ে বললেন ও সফলতা কামনা করলেন।
তবে আলোচনা কিংবা সেমিনার নয়, অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষণ ছিলো, বিশ্বের ১৫টি দেশের শিল্পী, কলা-কুশলীদের নানা ধরন ও বৈচিত্র্যের সাংস্কৃতিক উপস্থাপনা। তারা সকলেই গান কিংবা কবিতা কিংবা নৃত্যে তুলে ধরলেন নিজ নিজ ভাষার সৌন্দর্য্য ও স্বকীয়তা। আর তারই মধ্যদিয়ে রচিত হলো এক বন্ধন যা সকলকে একে অপরের ভাষার প্রতি, সংস্কৃতির প্রতি করে তুললো মর্যাদাশীল। যে মর্যাদার মূল ছিলো মুগ্ধতায় ভরা সকল উপস্থাপনার গভীরে প্রোথিত।
এছাড়াও অনুষ্ঠানস্থলে বসেছিলো স্কুল, কমিউনিটি, দূতাবাসগুলোর কিয়স্ক। আয়োজন ছিলো শিশুদের পাঠচক্র তথা গল্পবলা কার্যক্রম।
তবে সাংস্কৃতিক উপস্থাপনায় সকলের সামনে ভেসে উঠলো নানা বর্ণ নানা রঙের মানুষের ভাষার বৈচিত্র্যের পাশাপাশি তাদের সাজ-পোশাকের বৈচিত্র্য রঙের বাহার আর নানা ডিজাইনও ছিলো একইরকম উপভোগ্য। সবচেয়ে জ্বলজ্বল করে চোখে ভাসছিলো মঞ্চের এক কোনে বানানো শহীদ মিনারটি। যা পুরো আয়োজনকে করে তুলেছিলো মহান ও মনোরম।
আলোচনা শেষে আর্লিংটন কাউন্টির নেতৃবৃন্দসহ সকলে খালিপায়ে এগিয়ে গিয়ে সেই শহীদমিনারের বেদীতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানালেন ভাষা শহীদদের প্রতি। এসময় তাদের সাথে যোগ দিলেন কমিউনিটির বিশিষ্টজন ভার্জিনিয়া টেকের অধ্যাপক ড. সাইফুর রহমান, প্রথিতযশা সাংবাদিক সরকার কবীরউদ্দিন প্রমুখ।
পুরস্কারজয়ী পরিচালক, প্রযোজক, সিনেম্যাটোগ্রাফার রিমা কাপানির প্রাণবন্ত সঞ্চালনায় মূল সাংস্কৃতিক উপস্থাপনায় একদেশকে ছাপিয়ে যাচ্ছিলো আরেক দেশ। একটি সুন্দর উপস্থাপনা শেষ হতে আবার নতুন যেটি আসছিলো সেটিও যেনো ছাপিয়ে যাচ্ছিলো আগের দলকে। মূলতঃ নিজ সংস্কৃতির উপস্থাপনার সুযোগে যে কেহই তার সর্বোচ্চটুকু দিতে চেষ্টা করবে, তা সে যে দেশেরই হোক না কেনো? আর সেটাই হয়েছে। তাই দর্শক দেখতে পেলো যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি মেক্সিকো পেরু, বলিভিয়ার মতো আমেরিকান দেশের উপস্থাপনা। ওদিকে ভারত-শ্রীলঙ্কা হয়ে আরো প্রাচ্যের ইন্দোনেশিয়া পর্যন্ত। খোদ বাংলাভাষাভাষি ওপার বাংলার দলও তাদের উপস্থাপনায় মুগ্ধ করলো সবাইকে।

তবে সব ছাপিয়ে মায়ের ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছে যে জাতি, সেই বীর বাঙালীর বীরগাঁথা তুলে ধরে উপস্থাপিত হলো নৃত্যনাট্য। বাংলাদেশের একুশেপদকে ভূষিত মহীয়সী নৃত্যগুরু লায়লা হাসানের নেতৃত্ব ও নির্দেশনায় যুক্তরাষ্ট্রে বড় হয়ে ওঠা বাংলাদেশি বংশোদ্ভুত এক ঝাঁক ক্ষুদে থেকে বড় শিল্পী যে উপস্থাপনাটি উপহার দিলো তা ছুয়ে গেলো সবার মন। কাঁদিয়ে গেলো সকল প্রাণ।

ভাষার জন্য ভাই হারানোর বেদনায় ভরা একটি জাতি তার একুশকে অমর করে রাখবে চিরকাল। ইতিহাসের সেই ধারাবাহিকতা তুলে ধরলেন সাংবাদিক শিক্ষক আনিস আহমেদ। তবে এই অনুষ্ঠানের মধ্যদিয়ে অন্য ভাষাভাষিরাও সুযোগ পেলো তাদের নিজস্ব ভাষার মাহত্ব তুলে ধরতে। আর তাই অনুষ্ঠান শেষে সকলেরই এক কথা- এমন আয়োজন প্রতিবছরই হোক। এবং নিয়মিতই হোক।
প্রধান আয়োজন প্রিয়লাল কর্মকারের ইচ্ছাটিও ঠিক তাই। তিনি জানালেন, সামনে পবিত্র রমজান শুরু হয়ে যাবে বলেই একটু আগেভাগে এবারের আয়োজনটি সম্পন্ন করা হলো। আগামীতে একুশে ফেব্রুয়ারির কাছাকাছি সময়েই তাদের প্রচেষ্টা থাকবে এই আয়োজনের। অতএব আমাদের অপেক্ষা একবছরের, যখন আমরা আরো বড় পরিসরে, বৃহত্তর অংশগ্রহণে দেখতে পাবো উদযাপিত হচ্ছে, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস।
