অপরাজেয় বাংলা :: Aparajeo Bangla

জার্মান ফেডারেল নির্বাচন-২০২১

‘জোট’ নিয়ে ‘মহাজট’ এবারের বুন্ডেসটাগে

বিপ্লব শাহরিয়ার, জার্মান প্রবাসী সাংবাদিক

প্রকাশিত: ০৮:২৬ পিএম, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২১ বুধবার   আপডেট: ১১:৩১ পিএম, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২১ বুধবার

জার্মানিতে জোট সরকার গঠন সাধারণ একটি বিষয়। ইতিহাসে মাত্র একবারই প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে একক কোনো দলের সরকার গঠনের নজির আছে। সেটাও সেই ১৯৫৭ সালের ঘটনা। ৫০ দশমিক দুই শতাংশ ভোট পেয়ে এককভাবে ক্ষমতায় এসেছিলো ইউনিয়ন। এবারো জোট সরকারের বিকল্প নেই জার্মান বুন্ডেসটাগে। তবে পরিবর্তন ঘটতে পারে চালকের আসনে। ১৬ বছরের মের্কেল-অধ্যায়ের সমাপ্তিতে পরিবর্তনের পক্ষে জার্মান জনগন। নির্বাচনপূর্ব জনমত জরিপগুলো সে আভাসই দিচ্ছে।

বছরের শুরুতে জনমত জরিপে সুষ্পষ্ট ব্যবধারে এগিয়ে ছিলো ক্ষমতাসীন সিডিইউ-সিএসইউ। ইউনিয়নের পক্ষে জনমত ছিলো ৩৬ শতাংশ। তাদের নিকটতম গ্রিন পার্টির পক্ষে ছিলো ১৮ শতাংশ ভোট। কিন্তু নয় মাসে এই চিত্র পাল্টেছে বহুবার। আগস্টের শেষ সপ্তাহে বড় ধরনের চমক দেখায় ক্ষমতাসীনদের শরীক দল এসপিডি। সমান ২৩ শতাংশ জনমত দেখা যায় দুই দলের পক্ষেই। তারপর থেকেই জনমত বেড়েছে এসপিডির পক্ষে। ১৫ সেপ্টেম্বরের জনমত বলছে, এসপিডির পক্ষে সমর্থন ২৫ ভাগ ভোটারের। আর ২২ ভাগ সমর্থন নিয়ে সামান্য পিছিয়ে আছে ইউনিয়ন শিবির।

সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি- এসপিডি'র শরিক হিসেবে ১৯৯৮ সালে একবার কেন্দ্রক্ষমতায় গিয়েছিলো গ্রিনরা। এরপরের দেড় দশক শুধুই বিরোধী শিবিরে অবস্থান। কিন্তু আগামী সেপ্টম্বরের নির্বাচনে গ্রিনদের বড় ধরনের উত্থানের আভাস মিলছে। আবারো তাদের ঠাঁই হতে পারে জোট সরকারে। কিন্তু কাদের সঙ্গে?

কেনিয়া ফ্ল্যাগ
এবারের বুন্ডেসটাগ নির্বাচনের শেষ মূহুর্তে এসে জোট সরকারের কাঠামোয় সবচেয়ে আলোচিত 'কেনিয়া ফ্ল্যাগ ফরম্যাট'। অর্থাৎ 'লাল-কালো-সবুজ' কাঠানোর সরকার। সো্শ্যাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি- এসপিডি'র রঙ লাল, ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্র্যাটিক ইউনিয়ন- সিডিইউ'র রঙ কালো, আর সবুজ রঙ অবধারিতভাবে গ্রিন পার্টির। এই কাঠামোর জোট সরকারের সম্ভাবনা আছে সর্বাধিক ৬৮ শতাংশ। যেখানে চালকের আসনে থাকবে এসপিডি। অর্থাৎ আঙ্গেলা মের্কেলের স্থলাভিষিক্ত হবেন ওলাফ শোলৎস।

জার্মান ফ্ল্যাগ
সম্ভাব্য জোট সরকারের কাঠামোয় দ্বিতীয় অবস্থানে আছে জার্মান পতাকার ফরম্যাটটি। অর্থাৎ 'লাল-কালো-হলুদ'। যদিও জার্মান পতাকায় হলুদ রঙ নয়, বরং সোনালী রঙ রয়েছে। কিন্তু ফ্রি ডেমোক্র্যাটিক পার্টি- এফডিপি'র হলুদ রঙটি সোনালির অনেকাটা কাছাকাছি হওয়ায় এই ফরম্যাটের সম্ভাব্য জোটকে বলা হচ্ছে 'জার্মান ফ্ল্যাগ' বা 'ডয়েচল্যান্ড ফরম্যাট'। এই জোটের সম্ভাবনা রয়েছে ৬৩ ভাগ। এখানেও চালকের আসনে দেখানো হচ্ছে সেই এসপিডিকে। ক্ষমতার রাজনীতিতে এই ধরের জোট সরকার সম্ভব হলেও আদর্শিক কারণে তা কতটা বাস্তব এনিয়ে কিন্তু যথেষ্ট সংশয় আছে। 

'ট্র্যাফিক লাইট কোয়ালিশন'
সম্ভাবনার সূচকে তৃতীয় অবস্থানে (৫৮%) থাকলেও সবথেকে আলোচিত হচ্ছে এই জোট ব্যবস্থাটি। যেখানে প্রধান শরীক আবারো এসপিডি। তাদের সঙ্গে থাকছে গ্রিন পার্টি ব্যবসায়বান্ধব ফ্রি ডেমোক্র্যাটস- এফডিপি। এই মুহুর্তে রাইনল্যান্ড প্যালাটিনেট রাজ্যে কিন্তু 'ট্র্যাফিক লাইট কোয়ালিশন' সরকার বিদ্যমান। বাডেন-ভুর্টেনবার্গেও এমন একটি জোট চেয়েছিলেন গ্রিন সদস্যরা। যদিও গেলো রাজ্য নির্বাচনে গ্রিন-সিডিইউ জোটই রয়ে গেছে।

এ জাতীয় জোট সরকারের প্রাথমিক কাজটি কি হতে পারে? আর যাই হোক, সামাজিক সাম্য নিশ্চিত হবে না। কারণ এসপিডি এবং এফডিপি'র মধ্যে আদর্শিক ফারাক বিস্তর। আর জলবায়ু ইস্যুতেতো তিন দলই ভিন্ন অবস্থানে। পরিবেশবাদী দল গ্রিন পার্টি, এসপিডি শিল্পপন্থী আর এফডিপি ব্যবসায়পন্থী। তবে একটা ক্ষেত্রে তিনটি দলই গুরুত্ব দিতে পারে। সেটি হলো প্রযুক্তিগত অবকাঠামো। সুনির্দিষ্টভাবে বললে 'ডিজিটালাইজেশন'। মের্কেলের শাসনামলে এই খাতটিতে বেশ পিছিয়ে জার্মানি।

জ্যামাইকা কোয়ালিশন
ট্র্যাফিক লাইট জোটের সম্ভাব্য বিকল্প হতে পারে 'জ্যামাইকা কোয়ালিশন'। এই জোটের সম্ভাবনা ৫৪ শতাংশ। এই কাঠামোতে গ্রিন পার্টি এবং এফডিপি'র সঙ্গে প্রধান শরীক হিসেবে জোটে থাকবে ইউনিয়ন (সিডিইউ/সিএসইউ)। একমাত্র এই ধরনের জোটেই আরমিন লাশেটের পরবর্তী জার্মান চ্যান্সেলর হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। 

বামেদের সম্ভাবনা কতটুকু?
'লাল-সবুজ'লাল' জোটের সম্ভাবনাও (৫২%) দেখছেন নির্বাচন বিশ্লেষকরা। অর্থাৎ এসপিডি ও গ্রিন পার্টির সঙ্গে ক্ষমতার ভাগাভাগিতে থাকবে বাম দল। এসপিডি চেয়ারম্যান এপ্রিলের গোড়া থেকে বারবারই বলে আসছেন যে, 'এসপিডি-গ্রিন-বাম' জোট নিয়ে সংশয়ের কিছু নেই। সংশয়ের প্রসঙ্গ কেন আসছে?  বাম দলের মধ্যে সাবেক পূর্ব জার্মান কমিউনিস্ট পার্টির বীজ রয়ে গেছে বলে মনে করা হয়। এ কারণেই তাদের সাথে কাজ করতে সংশয়ী অনেকে। 
গ্রিন পার্টির কিছু সদস্য আছেন যারা এসপিডি এবং বাম দলের সাথে জোট বাঁধতে আগ্রহী। জার্মান রাজনীতিতে এরা 'সবুজ-লাল-লাল' হিসেবে পরিচিত। গ্রিন পার্টির বুন্ডেসটাগ সদস্য ক্রিস্টিয়ান কিন্ডলার স্পষ্টই বলে দিয়েছেন, "নীতিগত বিষয়ে ইউনিউন ও এফডিপির চাইতে এসডিপি ও বাম দলের সাথে আমাদের মিল অনেক বেশি।"

আবার গ্রিন পার্টিরই একটি পক্ষ বামদলের পার্লামেন্ট সদস্যদের বিশ্বাস করতে পারেন না। এই পক্ষটির মতে, বুন্ডেসটাগে বাম দলের সদস্যদের বেশিরভাগই কট্টরপন্থী। পার্লামেন্টে সংবেদনশীল কোনো বিষয়ের ভোটাভুটিতে তাই বামদের উপর তারা ভরসা রাখতে পারেন না।

একমাত্র সামাজিক, পরিবেশগত এবং কর ইস্যুতে পারষ্পরিক সহযোগিতার সম্ভাবনা দেখছেন বাম দলের জ্যৈষ্ঠ বুন্ডেসটাগ সদস্য জাহরা ভাগেনক্নেশট। তার মতে, এ ধরনের জোট গঠনের ক্ষেত্রে বড় বাঁধা পররাষ্ট্র নীতি। জার্মান সেনাবাহিনীর পুনরস্ত্রসজ্জা, সামরিক অভিযানের ক্ষেত্র বাড়ানো এবং রাশিয়ার সাথে দ্বন্দ্ব- মূলত এই তিন ইস্যুতে গ্রিন পার্টির নীতিগত অবস্থানেই উপরই নির্ভর করবে সম্ভাব্য এই জোটটি।

নাকি আবারো সিডিইউ-এসপিডি 'মহাজোট'?
আরেকটি মহাজোট গঠনের সম্ভাবনাও কিন্তু আছে। মের্কেলযুগে রক্ষণশীল এবং এসপিডি'র এই জোটটিতে জার্মানরা অভ্যস্ত হয়ে গেছে। তবে নির্বাচনী প্রচারণায় যে বিষয়গুলো ঘুরেফিরে আসছে, সেগুলো হলো, বর্তমান জোট কি সব প্রশ্নের ঊর্ধ্বে? তারা কি ব্যতিক্রম কিছু করতে পেরেছে? দেশকে সামনে এগিয়ে নিতে সিডিইউ/ সিএসইউ এবং এসপিডি জোটের আসলেই কি নতুন কিছু করার আছে?

২০১৭ সালের নির্বাচনেও কিন্তু একইধরনের আলোচনা লক্ষ্য করা গেছে। নির্বাচনের রাতে বেশিরভাগ মানুষই মোটামুটি নিশ্চিত ছিলেন যে, সিডিইউ/ সিএসইউ, এফডিপি এবং গ্রিন পার্টি জোট গঠন করতে যাচ্ছে। ক্ষমতার অংশীদারি ছেড়ে বিরোধী আসনে বসতে এসপিডিও যেন প্রস্তুত হয়েই ছিলো। কিন্তু শেষ মূহুর্তে এফডিপি এবং গ্রিনদের সাথে ইউনিয়নের আলোচনা ভেস্তে যায়। ফলে সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটদের সাথে আরেকটি মহাজোট গঠন করে ইউনিয়ন। এবারো তেমন কিছু হলে শুধু চালকের আসন বদলে যেতে পারে। অর্থাৎ প্রধান শরীক হবে এসপিডি, সঙ্গে থাকবে সিডিইউ।

গ্রিন পার্টি- সিডিইিউ/ সিএসইউ জোট কি সম্ভব?
রাজনৈতিক অঙ্ক কষলে ইউনিয়নের (সিডিইউ/ সিএসইউ) সাথে সম্ভাব্য একটি জোট হতে পারে গ্রিন পার্টির। প্রশ্ন হচ্ছে, গ্রিন পার্টি যদি ইউনিয়নের চেয়ে বেশি ভোট পায়? মে মাসের জনমত জরিপগুলো কিন্তু এমন আভাসই দিয়েছিলো। জোট বাঁধলে ইউনিয়ন কি নিজেকে ছোট শরিক হিসেবে মেনে নিতে পারবে? বাডেন-ভুর্টেনবার্গ রাজ্যের অভিজ্ঞতা কিন্তু ইউনিয়নের জন্য খুব একটা সুখের না। রাজ্যটিতে গ্রিন পার্টির বৃহৎ রাজনৈতিক দল হিসেবে আবির্ভাব, আর জোটে ইউনিয়নের ছোট শরিকের ভূমিকা তাদের মর্যাদা ক্ষুন্ন করেছে যথেষ্টভাবে। বুন্ডেসটাগেও এমনটি ঘটলে অস্তিত্ব সঙ্কটে পড়ে যেতে পারে ইউনিয়ন।

বিপ্লব শাহরিয়ার: জার্মানপ্রবাসী সাংবাদিক।