রোববার   ০১ আগস্ট ২০২১ || ১৬ শ্রাবণ ১৪২৮ || ২০ জ্বিলহজ্জ ১৪৪২

অপরাজেয় বাংলা :: Aparajeo Bangla

হস্তশিল্পে পাল্টে যাচ্ছে জামালপুরের অর্থনীতি

শওকত জামান, জামালপুর

১৫:৪৬, ১২ অক্টোবর ২০২০

আপডেট: ১৬:০৩, ১২ অক্টোবর ২০২০

২৩৬৫

হস্তশিল্পে পাল্টে যাচ্ছে জামালপুরের অর্থনীতি

জামালপুরের মেলান্দহ উপজেলার শ্যামপুর গ্রামের বাসিন্দা জেসমিন আলম একসময় ছিলেন গৃহিনী। স্বামী সামসুল আলম ব্যবসায় মার খাওয়ার পর সংসার পড়ে ঋনের চাপে। অভাব অনটনের সংসারে খাদ্য জোগাতেই হস্তশিল্পের কাজ শুরু করেন এই নারী।

তারপর আর তাকে পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। এখন মেলান্দহ বাজারে শাপলা মার্কেটে মৌচাক মহিলা অঙ্গন নামের হস্তশিল্প পণ্যের শো’রুমও আছে তার। পেয়েছেন জাতীয় শ্রেষ্ঠ জয়িতা ও জাতীয় শ্রেষ্ঠ নারী উদ্যোক্তার পুরস্কার। 

শুধু নিজের অর্জনে সীমাবদ্ধ না থেকে অন্যদের কর্মসংস্থান তৈরিতেও সাহায্য করছেন জেসমিন। এলাকার বেকার নারীদের নিয়ে গড়ে তুলেছেন মৌচাক নামের একটি সংগঠন। যার মাধ্যমে এখন পর্যন্ত হস্তশিল্প ও কাপড় সেলাইয়ের প্রশিক্ষন দিয়েছেন ৬শ বেকার নারীকে। 

জেসমিন আলমের মতো হস্থশিল্পের এমন শো’রুম এখন দেখা যায় জামালপুরের মোড়ে মোড়ে। বকুলতলার মোড়, দেওয়ানপাড়া, কলেজ রোড সব জায়গাতেই  চোখে পড়বে সারি সারি হস্ত শিল্পের দোকান। শহরে চলার পথে রাস্তার দু’ধারে শোরুমে তাদের তৈরি পণ্য বেচাকেনার দৃশ্য মিলবে দু’কদম পর পর।

অথচ এক সময় জামালপুরের গ্রামীন বিয়েতে অনিবার্য ছিল নকশী কাঁথা। নতুন কনের শ্বশুরবাড়ি যাত্রায় বাবার বাড়ি থেকে নকশী কাঁথা নেওয়ার রেওয়াজ ঐতিহ্যগত ভাবে চলে আসছে এ অঞ্চলে। কিন্তু সময়ের স্রোতে একসময় বিলীন হতে চলেছিলো এই শিল্প। 

কিন্তু ঐতিহ্য হারিয়ে যেতে দেননি গ্রামীন নারীরা। আশির দশকের শুরুর দিকেই ফের নকশী সূচি শিল্পের বাণিজ্যিক প্রসার শুরু হয়  জামালপুরে। বর্তমানে জামালপুর সদরসহ পুরো জেলায় প্রায় ২৫ হাজার দরিদ্র নারী এই পেশায় জড়িত। 

সংসারের অন্যান্য কাজের পাশাপাশি তারা ঘরে বসেই নকশী কাঁথা, নকশী চাঁদর, পাঞ্জাবী, ফতুয়া, কটি, ওয়ালম্যাট, কুশন কভার, শাড়ির নকশী পাড়, থ্রী-পিস ওড়নাসহ নানা রকম নকশী সামগ্রীর সূচিকর্ম করছে। হস্ত শিল্পে এ জেলার বেকার নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় লাভজনক এ পেশায় ঝুঁকছে পুরুষরাও। যা বদলে দিচ্ছে এই অঞ্চলের অর্থনীতি। 

জামালপুরের এই নকশী পণ্যের কদর এখন দেশে-বিদেশে। কিন্তু বিপণন সমস্যা, সরকারী পৃষ্টপোষকতা আর পূঁজির অভাবে শ্রমের ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এখানকার নারী-কর্মীরা। ইচ্ছে মতো মালিকের দেয়া অল্প মজুরীতেই সন্তুষ্ট থাকতে হয় তাদের। 

স্থানীয় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা বলছেন, একটি নকশী কাঁথা তৈরী করতে মজুরীসহ খরচ হয় ১৬০০ থেকে ১৮০০ টাকা। ঢাকার পাইকারী ব্যবসায়ীদের নিকট তা বিক্রি করতে হয় ২০০০ টাকায়। অথচ ঢাকার বড় বড় বিপনী বিতানগুলোতে তা বিক্রি হয় ৪ থেকে ৫ হাজার টাকায়। পূঁজির অভাবে তারা নিজেরা বাজারজাত করতে পারছেন না এসব পণ্য। ফলে পণ্যের ন্যায্য  মূল্য থেকে নিজেরা যেমন বঞ্চিত হচ্ছেন তেমনি যথাযথ শ্রমমূল্য পাচ্ছেনা নারী শ্রমিকরা ।

তবে হস্তশিল্প নিয়ে নতুন আশা দেখতে পারে শিল্পিরা। বর্তমান সরকার হস্তশিল্পের ব্যান্ডিং জেলা হিসেবে ঘোষনা করেছে জামালপুরকে। শিল্পটি প্রসারে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে নকশীপল্লী গড়ে তোলার। 

এ প্রসঙ্গে জেলা হস্তশিল্প ব্যবসায়ী এসোসিয়েশনের উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর সেলিম বলেন, ৫ হাজার ২’শত কোটি টাকা ব্যয়ে নকশী পল্লীর স্থান নির্ধারন করা হয়েছে। অর্থ বরাদ্ধ হলেও প্রকল্পটি বাস্তবায়ন ধীর গতিতে চলছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে সেখানে দক্ষ কর্মী গড়ে তোলার প্রশিক্ষন কেন্দ্র, হস্তশিল্পজাত পণ্যের বাজার ব্যবস্থা, বিদেশী উদ্যোক্তাদের থাকার ব্যবস্থাসহ নানা ব্যবস্থা থাকছে নকশীপল্লিতে।। এই নকশীপল্লী বাস্তবায়নের পর হস্তশিল্পে গতি এসে গ্রামীন অর্থনীতিতে গুরুত্বপুর্ণ ভুমিকা রাখবে বলে আশাবাদ ব্যাক্ত করেন তিনি।

এমন আশায় যে কেবল বুক বাঁধছেন জামালপুরের হস্তশিল্পিরা তেমনটা নয়। বাংলাদেশও স্বপ্ন দেখতে পারে নতুন রপ্তানি সম্ভাবনার। 


 

Dutch-Bangla Bank
TELETALK
খবর বিভাগের সর্বাধিক পঠিত