বৃহস্পতিবার   ১৭ জুন ২০২১ || ৪ আষাঢ় ১৪২৮ || ০৫ জ্বিলকদ ১৪৪২

অপরাজেয় বাংলা :: Aparajeo Bangla

রহনপুরের সাদামনের মানুষ জিয়াউল হক ও একটি নীল মাইক্রোবাস!

ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট, চাঁপাইনবাবগঞ্জ

০০:২৪, ৩ জুন ২০২১

৭৫৩

রহনপুরের সাদামনের মানুষ জিয়াউল হক ও একটি নীল মাইক্রোবাস!

সাদামনের মানুষ জিয়াউল হক
সাদামনের মানুষ জিয়াউল হক

চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার মুশরীভূজার সাদা মনের মানুষ দই বিক্রেতা জিয়াউল হককে পাওয়া যাচ্ছিলো না। কেউ বলছিলো, সাদা পোশাকে কে বা কারা তাকে তুলে নিয়ে গেছে। অন্যদিনের মতো বুধবার (২ জুন)ও রহনপুর দুপুরে রেল স্টেশনে দই বিক্রি করছিলেন জিয়াউল হক। তাদের বক্তব্য, দই বিক্রির সময় কয়েকজন এসে তাকে ধরে নীল রঙের একটি মাইক্রো বাসে করে তুলে নিয়ে যায়। 

খবরটি মুহুর্তে ছড়িয়ে পড়ে গোটা রহনপুরে। ঘটনা নিয়ে আলোচনা ডালপালা বিস্তার করতে থাকে নানান দিকে। মূল গুজব- জিয়াউল হক অপহৃত। স্থানীয় সংবাদ কর্মীরা খবর পেয়ে দৌঁড়-ঝাপ শুরু করেন। আর বিষয়টি জানতে সাধারণ মানুষ ফোন করতে থাকে সংবাদকর্মীদেরই। 

অপরাজেয়বাংলার প্রতিবেদক সরাসরি ফোন করেন জিয়াউল হকের নাম্বারে। ফোন ধরেন জিয়াউল হক। তার কাছে জানতে চাওয়া হয়, "আপনি কি অপহৃত হয়েছেন? "। এমন প্রশ্নে হাসতে থাকেন তিনি। বলেন, "নাজি বাপু। হামার কিছু হয়নি। ভাল আছি।" 

তাকে নিয়ে তৈরি হওয়া গুজবের কথা তাকে জানানো হলে আসল ঘটনা জানান জিয়াউল। তিনি বলেন, দুপুরে তিনি বিশ্রাম নেবার জন্য রহনপুর স্টেশন মসজিদে শুয়েছিলেন। এমন সময় তার কাছে একটা ফোন আসে। ফোন দিয়েছিলেন গোমস্তাপুর থানার উপ পরিদর্শক আবদুল্লাহ আল মামুন। তিনি জিয়াউল হককে বলেন, তাকে তিনি অনেকবার টিভিতে দেখেছেন। তার কার্যক্রম সম্পর্কে পত্রিকায় জেনেছেন। তাই সামনাসামনি তাকে ও তার কাজ দেখতে চান। তার বাড়িতে যেতে চান। পরে কয়েক মিনিট পরেই একটা গাড়ি স্টেশন মসজিদের সামনে আসে। সেই গাড়িতে আগে থেকেই বসে ছিলেন পুলিশের উপ পরিদর্শক আবদুল্লাহ আল মামুনসহ গোমস্তাপুর থানার কয়েকজন পুলিশ। সেই গাড়িতে করে জিয়াউল হককে সসম্মানে তার নিজ বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। 

স্টেশনের কয়েকজন মানুষ মূল ঘটনার কিছুই জানতেন না। কেবল দেখেছেন জিয়াউল হককে গাড়িতে তোলা হলে, গাড়িটি চলে গেলো। আর তাতেই গুজব। নিমিষে মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে, সাদা মনের মানুষ জিয়াউল হককে মাইক্রো বাসে তুলে নেয়া হয়েছে। 

২০০৭ সালের ঢাকার হোটেল শেরাটনে গণ্যমান্য অতিথি, সামরিক, সরকারি উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা, লেখক, শিল্পী, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবি, তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারে উপদেষ্টাদের উপস্থিতিতে ‘সাদা মনের মানুষ’ হিসেবে নির্বাচিত দশ জনকে আনুষ্ঠানিক সম্মানা দেয়া হয়। তাদেরই একজন ছিলেন এই জিয়াউল হক। 

জিয়াউল হক গোমস্তাপুরের গর্ব। কিন্তু তাই বলে এমন গুজবনির্ভর প্রচার, তা কতটা সঠিক? 

বিষয়টি জানতে গোমস্তাপুর থানার উপ পরিদর্শক আবদুল্লাহ আল মামুনকে ফোন দেয়া হলে সব শুনে তিনি হাসতে হাসতে বলেন, "জিয়াউল হক সাদা মনের মানুষ। তাকে দেখার ইচ্ছা ছিল। আজ সময় ও সুযোগ ছিল, একারণে তার বাড়িতে নিয়ে যাবার জন্য তাকে অনুরোধ করেছিলাম।" 

জিয়াউল হক  পরে অপরাজেয়বাংলাকে  জানান, গোমস্তাপুর থানার উপ পুলিশ পরিদর্শকসহ কয়েকজন পুলিশ তার প্রতিষ্ঠা করা লাইব্রেরি ঘুরে দেখেন। বিভিন্ন বিষয়ে জানতে চান। তারা খুব ভাল ব্যবহার করেছেন। জিয়াউল হকের সামাজিক কাজের প্রশংসা করেন তারা। বিভিন্ন ইতিবাচক কাজে সহযোগিতার আশ্বাসও দেন।

পুলিশের উপ পরিদর্শক আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, সাদা মনের মানুষ জিয়াউল হকের মতো মানুষকে উৎসাহ ও সহযোগিতা দেয়ার দরকার রয়েছে। সমাজে জিয়াউল হকের মতো মানুষদের বড় প্রয়োজন।

দই বিক্রেতা জিয়াউল হক ১৯৬৯ সাল হতে তিল তিল করে গড়ে তোলেন তার পারিবারিক লাইব্রেরি৷ একসময় প্রতিদিন তিনি দইয়ের ভাঁড় কাঁধে নিয়ে গ্রামে-গঞ্জে ফেরি করে বেড়াতেন। বর্তমানে সাইকেলে করে দই বিক্রি করতে যান। রেল স্টেশনে দিনভর বসে থেকে দই বিক্রি করেন ৷ আর দই বিক্রির টাকা দিয়ে দুই-একটি করে বই অথবা পত্রপত্রিকা কিনে কিনে তিনি গড়ে তোলেন লাইব্রেরি৷ অভাবগ্রসস্থ মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের মাঝে বিনামূল্যে পাঠ্যবই দেন।

এসব কারণেই ২০০৭ সালের রাজধানীর পাঁচতারকা হোটেলে গণ্যমান্য অতিথি, সামরিক, সরকারি উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা, লেখক, শিল্পী, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবি, তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারে উপদেষ্টাদের উপস্থিতিতে ‘সাদা মনের মানুষ’ হিসেবে জিয়াউল হকসহ নির্বাচিত দশ জনকে আনুষ্ঠানিক সম্মানা দেয়া হয়। 

এ ছাড়াও ১৯৯৯ সালে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা প্রশাসন, ১৯৯৩ সালে রহনপুর ইউসুফ আলী কলেজ, ২০০৩ সালে ভোলাহাট ছাত্র কল্যাণ সংস্থা, ১৯৯৯ সালে গোমস্তাপুর বইমেলা কর্তৃপক্ষ, ২০১০ সালে ঢাকাস্থ চাঁপাই নবাবগঞ্জ জেলা সমিতি থেকে সম্মাননা দেয়া হয় জিয়াউল হককে। 

তিনি সকলের প্রিয়। সে কারণে তাকে নিয়ে উদ্বেগটাও বেশি। তবে এমন মানুষ সমাজে কম। আর ঘটনা যাচাই না করে, মূল বিষয়টি না জেনে গুজবে বিশ্বাস করার মানুষ সমাজে দিন দিন বাড়ছেই। 

Dutch-Bangla Bank
TELETALK
খবর বিভাগের সর্বাধিক পঠিত